Tuesday, January 4, 2011

পুলিশের ইন্সপেক্টর প্রথম ও এসআই দ্বিতীয় শ্রেণীর পদমর্যাদা পাচ্ছে

পুলিশের ইন্সপেক্টর প্রথম ও এসআই দ্বিতীয় শ্রেণীর পদমর্যাদা পাচ্ছে

০০ইত্তেফাক রিপোর্ট, ডিসেম্বর ৩১, ২০১০

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পুলিশ পরিদর্শকদের (ইন্সপেক্টর) প্রথম শ্রেণীর (নন ক্যাডার) পদমর্যাদা দেয়ার জন্য সরকারি নীতিগত সিদ্ধান্ত অনুমোদন করা হয়েছে। আগামী ৪ জানুয়ারির আগে যে কোন মুহূর্তে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ সম্পর্কিত প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে পুলিশ ইন্সপেক্টরদের প্রথম শ্রেণীর কর্মচারির পদমর্যাদা চূড়ান্ত হবে। বুধবার সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ফিরোজ মিয়ার সভাপতিত্বে পুলিশ ইন্সপেক্টরদের পদমর্যাদা প্রদান সম্পর্কিত এক সভায় বিষয়টি বিধিগত অনুমোদনের জন্য চূড়ান্ত করা হয়েছে। এমনকি বুধবার বিকালেই এ সংক্রান্ত নথিপত্র অনুমোদন দিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে বলে সংশিস্নষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে সারাদেশে ৩ হাজার ইন্সপেক্টর এবং ১২ হাজার সাব-ইন্সপেক্টর রয়েছেন। বর্তমানে ইন্সপেক্টররা দ্বিতীয় এবং সাব-ইন্সপেক্টররা তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারী পদমর্যাদায় সরকারি সুবিধা পাচ্ছেন। ইন্সপেক্টর এবং সাব-ইন্সপেক্টরদের দাবির প্রেক্ষিতে চলতি পুলিশ সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের গ্রেড উন্নয়নের আশ্বাস দিয়েছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় পুলিশ অফিসারদের মর্যাদার উন্নয়ন করতে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

জনশক্তি রফতানির বড় বাজার বন্ধ কমছে প্রবাসী আয়

জনশক্তি রফতানির বড় বাজার বন্ধ কমছে প্রবাসী আয়

এম সায়েম টিপু

সরকারি হিসাবে গত অর্থবছরে বিদেশ থেকে প্রবাসীরা প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলার বা ৭৪ হাজার কোটি টাকা পাঠিয়েছে। এ হিসাব শুধু ব্যাংকিং চ্যানেলে আসা টাকা। ধারণা করা হয়, সমপরিমাণ টাকা অবৈধ চ্যানেলে আসে। এ আয় বাড়িয়ে ৩০ বিলিয়ন বা ২ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা পর্যন- নিয়ে যাওয়া সম্ভব বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে অভিজ্ঞরা। এজন্য খুব বেশি বিনিয়োগের প্রয়োজন নেই। শুধু সরকারের কিছু উদ্যোগ, কূটনৈতিক তৎপরতারই প্রয়োজন। যথাযথ প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা এবং বাজার খুঁজে পাঠানোর ব্যবস্থা করলেই দেশ বড় ধরনের লাভবান হতে পারে। কিন্তু বিশাল সম্ভাবনার এ খাত ভয়াবহভাবে মন্দাক্রান্ত হয়ে পড়েছে। কিছু ব্যবসায়ী অতি মুনাফার লিপ্সা ও সরকারের অবহেলায় বর্তমানে কররুণ অবস্থার সৃষ্টি বলে মনে করেন এ খাতের অভিজ্ঞরা।

প্রতিবেশী, প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর যেখানে প্রতিনিয়ত জনশক্তি রফতানি ও প্রবাসী আয় বাড়ছে বাংলাদেশের সেখানে কমে প্রায় অর্ধেকে চলে এসেছে। জনশক্তি রফতানির অন্যতম বাজার মধ্যপ্রাচ্যের সব দেশে এবং মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে। সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, মালয়েশিয়ায় গত প্রায় ২ বছর ধরে বাংলাদেশ থেকে লোক নেয়া বন্ধ করে দিয়েছে। কিছু কিছু লোক যাচ্ছে শুধু সংযুক্ত আরব আমিরাতে। এসব দেশ থেকে প্রতিদিনই খালি হাতে ফেরত আসছে হাজার হাজার বাংলাদেশি শ্রমিক।

বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরব ও মালয়েশিয়ায় লোক নেয়া বন্ধ করলেও বিশ্বের একমাত্র হিন্দুপ্রধান রাষ্ট্র্র নেপাল ও ভারত থেকে লোক নিচ্ছে। এছাড়াও কুয়েত, কাতার, ওমানও লোক নিচ্ছে পাকিস্তান, ভারত, ফিলিপাইন ও নেপাল থেকে। আগে মুসলিম প্রধান দেশ হিসেবে পছন্দের শীর্ষে ছিল বাংলাদেশ। জনশক্তি রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রবাসী বাংলাদেশি ৭০ লাখ কমর্ীর মধ্যে ৩৫ লাখই থাকেন সৌদি আরব, কুয়েত ও মালয়েশিয়ায়। কাজেই এ তিন দেশের বাজার চালু করা না গেলে আগামীতে জনশক্তি রফতানি খাতে আরো ভয়াবহ দুরবস্থা নেমে আসবে। সরকারি হিসাবে ১৯৭৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গেছে প্রায় ৭১ লাখ বাংলাদেশি। তারা এ পর্যন্ত ৪ লাখ ৬২ হাজার কোটি টাকা দেশে পাঠিয়েছে। বর্তমানে জনশক্তি রফতানি ও রেমিট্যান্স দুটোই কমেছে। ২০০৭ সালে বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন দেশে মোট জনশক্তি রফতানি হয়েছে ৮ লাখ ৩২ হাজার ৬০৯ জন। ২০০৮ সালে রফতানি হয় ৮ লাখ ৭৫ হাজার ৫৫ জন। ২০০৯ সালে কমে হয় ৪ লাখ ৭৫ হাজার ২৭৮ জন। ২০১০ সালে নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে মোট জনশক্তি রফতানি হয় ৩ লাখ ৫৬ হাজার ১০২ জন। দেখা যায়, ২০০৮-০৯ সাল থেকে প্রধান রফতানি বাজার সৌদি আরব, কুয়েত, মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রফতানি প্রায় শূন্যের কোঠায় নামতে শুরু করেছে। সিঙ্গাপুর, ওমান, বাহরাইনসহ কয়েকটি দেশে কিছু কিছু জনশক্তি রফতানি হওয়ায় মোট রফতানির পরিমাণ কিছুটা বেড়েছে।

অপরদিকে চলতি অর্থবছরে ৪ লাখ ৭৭ হাজার জনশক্তি রফতানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও ৫ মাসে গেছে মাত্র ১ লাখ ৫৩ হাজার। যা বছর শেষে লক্ষ্যমাত্রার ৬৩ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব হবে। একইভাবে প্রবাসীদের পাঠানো আয় রেমিট্যান্সও কমতে থাকে।

এদিকে ২০০৯ সালের এপ্রিলে এবং এ বছরের প্রথম দিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, পররাষ্ট্র্র, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রীসহ উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল নিয়ে সৌদি আরব, কুয়েত ও মালয়েশিয়া সফর শেষে বলেছিলেন বন্ধ শ্রমবাজার খুলে দেয়া হবে। এছাড়াও পররাষ্ট্র্রমন্ত্রী দীপু মণি ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী খোন্দকার মোশাররফ হোসেন মালয়েশিয়ার সফর শেষে সে দেশের শ্রমবাজার সংকট কেটে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু দীর্ঘদিন পরও সমস্যার কোনো সুরাহা হয়নি।

জনশক্তি রফতানির এ অবস্থার জন্য এ খাতের ব্যবসায়ীরা সরকারের কূটনৈতিক ব্যর্থতা বলে মনে করেন। জনশক্তি রফতানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিসের (বায়রা) সভাপতি আবুল বাশার বলেন, কূটনৈতিক দুর্বলতার জন্য আমরা একের পর এক বাজার হারাচ্ছি। তিনি আরো বলেন, জনশক্তি রফতানি বাড়াতে প্রতিপক্ষ দেশ যেখানে প্রতি মাসে কূটনৈতিক তৎপরতা চালায়, সেখানে বছরেও আমাদের কোনো তৎপরতা দেখা যায় না। তিনি বলেন, আমরা কোনো দিক-নির্দেশনা পাচ্ছি না। এখানে উল্লেখ্য, দীর্ঘদিন থেকে জনশক্তি রফতানিকারকরা দাবি জানিয়ে আসছিল, জোর কূটনীতিক তৎপরতা শুরু না করলে সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, ওমানসহ মুসলিম দেশগুলোতে জনশক্তি রফতানি চূড়ান্তভাবে বন্ধ হয়ে যাবে। এখন সে আশঙ্কাই সত্য হয়ে দাঁড়াল।

এদিকে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী খন্দকার বলেন, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় এবং জনশক্তি রফতানিকারকদের কারণে বিভিন্ন দেশে শ্রমবাজার হারাচ্ছে বাংলাদেশ। সৌদি আরব ও মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজার হারানোর এটাই প্রধান কারণ জানিয়ে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এ অবস্থা বন্ধ না হলে বাংলাদেশের শ্রমবাজার ভবিষ্যতে আরো সংকুচিত হয়ে পড়বে। মন্ত্রী স্বীকার করে বলেন, বিদেশে বাংলাদেশের শ্রমবাজার একেবারেই সংকুচিত হয়েছে।

বায়রার মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী বলেন, ব্যবসা এখন প্রায় বন্ধ। অনেক জনশক্তি রফতানিকারক দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহ করতে না পেরে ব্যবসা গুটিয়ে আবার অনেকে সংকুচিত করে কোনোরকমে টিকে আছে। তিনি বলেন, এ অবস্থায় সাধারণ ব্যবসায়ীদের চাপের মুখে রয়েছে বায়রা নেতারা। বায়রার সাবেক সভাপতি গোলাম মোস্তফা বলেন, প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্র্র মন্ত্রীসহ সরকারের শীর্ষপর্যায়ের কূটনীতিক তৎপরতাই পারে ভয়াবহ এ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি দিতে। তার মতে, সৌদি আরব, কুয়েতসহ যেখানে প্রধানমন্ত্রী সফর করেছেন, সেখানে ফলোআপ দরকার ছিল।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরবেও প্রায় ২ বছর ধরে জনশক্তি রফতানি বন্ধ হয়ে গেছে। সরকারি হিসাবে সৌদি আরবে বাংলাদেশের শ্রমিক রয়েছে প্রায় ২৬ লাখ। আর বেসরকারি হিসাবে মোট বাংলাদেশির সংখ্যা ৩০ লাখের বেশি। বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি জনশক্তি রফতানির দেশ সৌদি আরবে গত ২ বছরে মাত্র ২০ হাজার লোক গেছে। এর আগে ২০০৮ সাল বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরব গেছে ১ লাখ ৩২ হাজার লোক। ২০০৭ সালে গেছে ২ লাখ ৪ হাজার ১১২ জন। একই অবস্থা মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশেও।

এছাড়া সৌদি আরবে আকামা পরিবর্তনের (চাকরি পরিবর্তন) সুযোগ না পাওয়ায় সেখানে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকরা অনিশ্চিয়তার মধ্যে পড়েছেন। এর মধ্যে লক্ষাধিক শ্রমিক আকামা সমস্যায় পালিয়ে অবৈধভাবে কাজ করছেন। আবার যারা পুলিশের হাতে ধরা পড়ছেন তাদের খালি হাতে ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে। ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, নেপাল থেকে শ্রমিক নেয়া ও আকামা পরিবর্তনের সুযোগ দেয়া হলেও বাংলাদেশ একেবারেই বঞ্চিত।

কাতারে ২০০৭-০৮ সালে প্রায় ৪১ হাজার রফতানি হলেও ২০০৯-১০ সালে রফতানি হয়েছে ২২ হাজার ৫০০ জন। ওমান থেকে লক্ষাধিক বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানোর আয়োজন চূড়ান- হয়ে গেলেও তাদের জন্য সরকারের কোনো তৎপরতা নেই। জানা যায়, ওমানে প্রায় ৩ লাখ বাংলাদেশি বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত থাকলেও এর মধ্যে অবৈধ লক্ষাধিক বাংলাদেশি শ্রমিকের ভাগ্য এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

জনশক্তি রফতানি ব্যবসায়ীরা বলেন, কূটনৈতিক তৎপরতার অভাব ও সেখানে অবস্থানরত বাংলাদেশি শ্রমিক এবং ব্যবসায়ীদের অনৈতিক, অবৈধ কার্যক্রমের প্রচারণার জন্য বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া রোহিঙ্গাসহ প্রতিদ্বন্দ্বী অন্যান্য দেশের বিভিন্ন ষড়যন্ত্রের কারণে সৌদি সরকারের কাছে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ইমেজ খারাপ হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশের অন্যতম শ্রমবাজার কুয়েতে প্রায় ৫ লাখ বাংলাদেশি আছে। মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশটিতে গত ৩ বছর ধরে বাংলাদেশি জনশক্তি রফতানি বন্ধ আছে। বাজারটি চালু করতে কূটনৈতিক উদ্যোগ তেমন নেয়া হয়নি। এ বছরের প্রথম দিকে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের সফরের পরও কুয়েতের শ্রমবাজার খুলে দেয়ার ব্যাপারে আশাপ্রদ কোনো খবর পাওয়া যায়নি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কুয়েতের আমিরের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার অনুরোধ জানালেও কুয়েতের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে কোনো আশার বাণী শোনানো হয়নি। এমনকি বাংলাদেশ ও কুয়েতের মধ্যে যে ৪টি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল সেখানেও বন্ধ শ্রমবাজার খুলে দেয়ার ব্যাপারে কোনো কিছু ছিল না বলে জানা যায়। নতুন করে লোক না গেলেও ফেরত আসার সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে।

২০০৫-০৬ সালে কুয়েতে যেখানে জনশক্তি রফতানি হয়েছিল প্রায় ৮৩ হাজার; সেখানে ২০০৮-০৯ ও চলতি বছরের ১১ মাসে মাসে রফতানি হয়েছে মাত্র ৩৬৮ জন। ২০০৭ সালে রফতানি হয়েছিল ৪ হাজার ২১২ জন। সরকারের জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ বু্যরোর তথ্য অনুযায়ী, আগে বছরে গড়ে ২০ থেকে ২৫ হাজার মানুষ আর ২০০৯ সালে গেছে মাত্র ১০ জন। একই অবস্থা মালয়েশিয়ার ক্ষেত্রেও। অর্থনৈতিক মন্দার পর মালয়েশিয়া, নেপাল থেকে শ্রমিক নিলেও বাংলাদেশের জন্য বন্ধ দরজা আর খোলেনি। মালয়েশিয়ার চাহিদামতো শ্রমিক সরবরাহ করতে সে দেশের জনশক্তি রফতানিকারকরা রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন। এদিকে বাংলাদেশকে নতুন লোক নেয়ার অনুমতি না দিলেও ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়া বাংলাদেশিদের ধরে ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী পররাষ্ট্র্রমন্ত্রী দীপু মণি ও প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী মালয়েশিয়া সফর করে বন্ধ বাজার খোলার আশ্বাস দিলেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। এদিকে লোক না গেলেও সেখান থেকে ফেরত আসার সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। ২০০৫-০৬ সালে কুয়েতে যেখানে জনশক্তি রফতানি হয়েছিল প্রায় ৮৩ হাজার; সেখানে ২০০৮-০৯ ও চলতি বছরের ১১ মাসে মাসে রফতানি হয়েছে মাত্র ৩৬৮ জন। ২০০৭ সালে রফতানি হয়েছিল ৪ হাজার ২১২ জন। সরকারের জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ বু্যরোর তথ্য অনুযায়ী, আগে বছরে গড়ে ২০ থেকে ২৫ হাজার মানুষ আর ২০০৯ সালে গেছে মাত্র ১০ জন।

একই অবস্থা মালয়েশিয়ার ক্ষেত্রেও। অর্থনৈতিক মন্দার পর মালয়েশিয়া, নেপাল থেকে শ্রমিক নিলেও বাংলাদেশের জন্য বন্ধ দরজা আর খোলেনি। মালয়েশিয়ার চাহিদামতো শ্রমিক সরবরাহ করতে সে দেশের জনশক্তি রফতানিকারকরা রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন। এদিকে বাংলাদেশকে নতুন লোক নেয়ার অনুমতি না দিলেও ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়া বাংলাদেশিদের ধরে ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী পররাষ্ট্র্রমন্ত্রী দীপু মণি ও প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী মালয়েশিয়া সফর করে বন্ধ বাজার খোলার আশ্বাস দিলেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। এদিকে লোক না গেলেও সেখান থেকে ফেরত আসার সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। ২০০৯ সালে দেশটিতে গেছে ১২ হাজার ৪০২ জন। ফিরেছে ১৬ হাজার ৮৭৭ জন। আর এ বছর ১১ মাসে মালয়েশিয়া গেছে মাত্র ৮০৬ জন। বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয়ায় মালয়েশিয়া বিদেশি শ্রমিক আমদানি প্রায় বন্ধ করে দেয়। সমপ্রতি তারা আবারো বিদেশি শ্রমিক নেয়া শুরু করেছে। আগামী ৬ মাসের মধ্যে তারা নেপাল থেকে ১ লাখ শ্রমিক নেয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছে। কিন্তু বাংলাদেশি ৫৫ হাজার শ্রমিক নেয়া বন্ধ এবং ভিসা নবায়নের ওপর নিষেধাজ্ঞা এখনো প্রত্যাহার করা হয়নি।
Source: Daily Ittefaq, 25 Dec-2010

অপার সম্ভাবনাময় জাহাজ নির্মাণ শিল্প

অপার সম্ভাবনাময় জাহাজ নির্মাণ শিল্প

আরএইচ কৌশিক

রফতানির নতুন সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে চলছে বাংলাদেশের জাহাজ নির্মাণ শিল্প। সরকারের যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা এবং পুঁজি বিনিয়োগকারিরা এ খাতে মনোযোগী হলে আগামীতে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক খাতে নতুন এক বিপ্লবের সূচনা ঘটবে। প্রতি বছর আয় হবে কয়েক হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা। এ খাত থেকে কর্মসংস্থান হবে লক্ষাধিক দক্ষ শ্রমিক।

শুধু তাই নয়, জাহাজ নির্মাণে বাংলাদেশকে পরিপূর্ণ একটি দেশে পরিণত করার দুর্লভ সুযোগ করা গেলে এ খাতটি এ দেশের বিদ্যমান সব ক'টি খাতকে ছাড়িয়ে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রথম স্থানে চলে যাবে। সরকারি-বেসরকারি এবং জাহাজ নির্মাণ খাতে পুঁজি বিনিয়োগকারী সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও এ খাতের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

জাহাজ নির্মাণ শিল্পে বাংলাদেশের গর্বিত অতীত আছে। বলা যায়, জাহাজ নির্মাণে বাংলাদেশ আবার সেই গৌরবোজ্জ্বল অতীত ফিরিয়ে আনার পথে। এরই মধ্যে বাংলাদেশের নির্মিত জাহাজ ইউরোপে রফতানি হচ্ছে। বাংলাদেশে নির্মিত জাহাজ বেশ উন্নত বলে ইউরোপে প্রশংসিত হয়েছে।

নানা কারণেই জাহাজ নির্মাণ শিল্পের জন্য বাংলাদেশ অন্যতম স্থান হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় তুলনামূলক কম খরচ। জাহাজ নির্মাণে প্রচুর দক্ষ-অদক্ষ শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশে জাহাজ নির্মাণে স্বল্প খরচে প্রচুর শ্রমিক পাওয়া যায়। আর এ কারণে নির্মাণ খরচ অনেক কম। দক্ষিণাঞ্চল সমুদ্রবেষ্ঠিত হওয়ায় ভৌগলিক সুবিধা এ সম্ভাবনার ক্ষেত্রে অন্যতম সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।

সমপ্রতি জাতিসংঘের অঙ্গ সংস্থা আন্তর্জাতিক নৌ-সংস্থা আইএমও'র জারিকৃত আইএসপিএস কোডের কারণে ২৫ বছরের বেশি পুরনো জাহাজগুলো আগামী বছর থেকে চলাচল করতে পারবে না। আইএমও'র এ নির্দেশনার কারণে কেবল ইউরোপীয় দেশগগুলোকেই কিছুদিনের মধ্যে প্রায় ৩ হাজার নতুন জাহাজ বাদ দিতে হবে এবং এর স্থলে নতুন জাহাজ যোগ করতে হবে। আর এ জাহাজ নির্মাণে বাংলাদেশই হতে পারে অন্যতম বিকল্প হিসেবে। কারণ বিশ্বের অন্যতম জাহাজ নির্মাণকারী দেশ চীন, ভিয়েতনাম, ভারতের সব ক'টি শিপইয়ার্ড আগামী ৫ বছরের জন্য বুকড হয়ে আছে। এ বিষয়টি মাথায় রেখে সংশ্লিষ্ট কতর্ৃপক্ষ উদ্যোগ নিলে সম্ভাবনার পালে লাগবে নতুন হাওয়া।

জানা গেছে, বাংলাদেশে চলতি বছরে সাড়ে ৩ কোটি টাকা মূল্যের জাহাজ নির্মাণ কাজ চলছে। ৩টি ইয়ার্ড রফতানিমুখী জাহাজ নির্মাণ করছে। ইয়ার্ডগুলো হলো_ আনন্দ শিপইয়ার্ড, ওয়েস্টার্ন মেরিন এবং হাইস্পিড। তবে এ ধরনের আরো ইয়ার্ড থাকলে এ খাত থেকেই বাংলাদেশের রফতানি বছরে ১ বিলিয়ন ডলার আয় করা সম্ভব হতো। ইতোমধ্যে জাহাজ রফতানি করে বাংলাদেশ প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করেছে। অভিযোগ রয়েছে, একটি গোষ্ঠী এ খাতে নতুন উদ্যোক্তাদের অনুমোদন দিতে বাধা দিচ্ছে। যার ফলে চাহিদা ও সুযোগ থাকার পরও নতুন উদ্যোক্তারা আসতে পারছে না।

তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি এ খাতে রয়েছে নানা সমস্যাও। অবকাঠামোগত সমস্যা, ব্যাংক ঋণের ক্ষেত্রে উচ্চ সুদের হার, কাঁচামাল আমদানিতে ব্যাংক গ্যারান্টির ক্ষেত্রে দেশীয় ব্যাংকের প্রয়োজনীয় রেটিং না থাকা। উদ্যোক্তারা জানান, এ খাত বিকাশে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন অবকাঠামো সুবিধা নিশ্চিত করা এবং শতভাগ রফতানিমুখী শিল্পে প্রচলিত শর্তে বন্ডেড সুবিধা। এ শিল্প বিকাশে যেসব সমস্যা রয়েছে তার অন্যতম হলো ব্যাংক সার্ভিস চার্জ অনেক বেশি। জাহাজ নির্মাণের জন্য বিদেশ থেকে যে কাঁচামাল নিয়ে আসা হয় সেগুলোর জন্য ব্যাংক গ্যারান্টি দিতে হয়। বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর আন্তর্জাতিক রেটিং অনেক কম হওয়ায় বিদেশ থেকে তা প্রত্যাখ্যান হয়। তখন বিদেশি কোনো ব্যাংক থেকে এ গ্যারান্টি নিতে হয়। এ গ্যারান্টি বাবদ কমিশন অনেক বেশি। জাহাজ নির্মাণ যেহেতু সময়সাপেক্ষ ব্যাপার এ জন্য দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যাংক ঋণ নিতে হয়। অন্যান্য কাজের ক্ষেত্রে যেখানে সুদ দিতে হয় ৭ থেকে ৮ শতাংশ সেখানে এ শিল্পের জন্য সুদ দিতে হয় ১৫ থেকে ১৬ শতাংশ। কাঁচামাল আমদানি করার সময় ডিউটি খরচও অনেক বেশি, ১০ মিলিয়ন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করতে ৩ থেকে ৪ মিলিয়ন ডলার খরচ হয়। এছাড়া ছাড়পত্রের ক্ষেত্রেও রয়েছে নানা সমস্যা। ইয়ার্ডসহ আনুষঙ্গিক অবকাঠামো সুবিধা, শিল্প প্রসারে সহায়তা, প্রণোদনা সুবিধা নিশ্চিত করা না হলে সম্ভাবনাময় এ খাতটি নষ্ট হয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা।

অবশ্য জাহাজ নির্মাণ শিল্পের সমস্যাগুলো দূর করে সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীন এক্সপোর্ট প্রোমোশন বু্যরো (ইপিবি) একটি স্ট্যান্ডিং কমিটি গঠন করেছে।

রফতানিমুখী জাহাজ নির্মাণ শিল্পের উন্নয়নে ২০০ কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করার উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সম্মতি দেয়ার পরও অর্থ মন্ত্রণালয়ের আপত্তির কারণে তহবিল গঠনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পারেনি কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

সোনালি অতীত : আমাদের দেশে জাহাজ শিল্প প্রতিষ্ঠার সমৃদ্ধ অতীত রয়েছে। যখন পালে চলা কাঠের জাহাজ সাত সমুদ্র তের নদী পাড়ি দিত সে যুগে বাংলাদেশে জাহাজ নির্মাণ শিল্পের ছিল রমরমা অবস্থা। নৌ বাণিজ্যে পারঙ্গম আরবদের সহযোগিতায় চট্টগ্রামে গড়ে উঠেছিল জাহাজ নির্মাণ শিল্পের বিশাল অবকাঠামো। চট্টগ্রামে নির্মিত সমুদ্রগামী জাহাজ বাণিজ্যতরী হিসেবে রফতানি করা হতো পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। শুধু তাই নয়, রণতরী হিসেবেও চট্টগ্রামের জাহাজের ছিল বিশেষ কদর। স্পেনীয় রণতরীগুলো যখন ভূমধ্যসাগর, ভারত মহাসাগর এবং আটলান্টিক মহাসাগরে দাঁপিয়ে বেড়াত তখন সেই বহরে বাংলায় নির্মিত নৌযানের সংখ্যা একেবারে কম ছিল না। আর্মাড নামে পরিচিত স্পেনীয় ও ব্রিটিশ নৌবাহিনীর মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী নৌযুদ্ধে চট্টগ্রামে নির্মিত বহু রণতরী যে স্পেনীয় বহরে অন্তভর্ুক্ত হয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল এ সত্য ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত। বাষ্পচালিত নৌযান আবিষ্কারের পর থেকে বাংলাদেশ জাহাজ শিল্পে ঝিমিয়ে পড়ে। প্রশিক্ষিত শিপ বিল্ডিং প্রকৌশলীর অভাবে জাহাজ শিল্প ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। পরে প্রায় ১০০ বছর পর ২০০৮ সালে আনন্দ শিপইয়ার্ড ডেনমার্কে স্টেলা ম্যারিস রফতানির মাধ্যমে এ শিল্পের পুনরুত্থান এবং নবযাত্রা শুরু করে। আবার বাংলাদেশি জাহাজ আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করে।

এখন যা প্রয়োজন : ইতোমধ্যেই বিশ্বে বাংলাদেশের জাহাজ নির্মাণ কারিগরদের সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে। এ সুনাম আরো বৃদ্ধি করতে হলে অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি ও বৃদ্ধি করতে হবে। এ শিল্পের জন্য ব্যাংক ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিট করতে বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ঘোষণা করলেও তা এখনো কার্যকর হয়নি। ভারতে এ শিল্পে ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশ, দক্ষিণ কোরিয়ায় ৭ শতাংশ। কিন্তু বাংলাদেশে ১৩ থেকে ১৪ শতাংশ। বিদেশি ব্যাংকের গ্যারান্টি চার্জ হিসেবে আরো ৪ থেকে ৫ শতাংশ বর্তায়। উদ্যোক্তারা বলছেন, আমরা এইড চাই না, চাই ট্রেড ফেসিলিটি। এ শিল্পের জন্য ট্রেড ফেসিলিটি নিশ্চিত ও কার্যকর করা হোক।

সম্ভাবনা : জাহাজ নির্মাণ একটি শ্রমঘন শিল্প খাত। উদ্যোক্তারা মনে করেন, বাংলাদেশের শ্রমবাজার অত্যন্ত সস্তা হওয়ায় এক্ষেত্রে আমরা বাড়তি সুবিধা পেতে পারি। স্বল্পতম মজুরির দ্বিগুণ দক্ষ জনবল সুদক্ষ প্রকৌশলী রয়েছে। জাহাজ নির্মাণে বিশেষজ্ঞেরও কমতি নেই। বাংলাদেশের জাহাজ নির্মাণ শিল্পের কথা ইউরোপসহ উন্নত দেশগুলোতে গিয়ে পেঁৗছেছে। দেশি প্রযুক্তি ও লোকবল ব্যবহার করে দেশের শিপইয়ার্ডগুলোতে যাত্রীবাহী জাহাজ, অয়েল ট্যাংকার, টাগবোট, ফিশিং বোটসহ নানা ধরনের যান্ত্রিক নৌযান নির্মাণে বাংলাদেশ সফলতা দেখিয়েছে।

বিশ্বে প্রতি বছর সমুদ্রগামী জাহাজের সংখ্যা ৬ শতাংশ হারে বাড়ছে। কিন্তু জাহাজ নির্মাণ শিল্প বাড়ছে ৩ শতাংশ হারে। জাহাজের সংখ্যা ও নির্মাণের মধ্যে এ বিশাল ব্যবধানটির আর্থিক মূল্য ৩৩ হাজার ২৮ কোটি ডলার বলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের অভিমত। আর জাহাজ নির্মাণ শিল্পে যে ৩ শতাংশ ঘাটতি রয়েছে তার ১ শতাংশও যদি বাংলাদেশ পূরণ করতে পারে তাহলে প্রায় ১২ হাজার কোটি ডলারের বাজার বাংলাদেশ দখলে নিতে পারবে। এ পরিমাণ আয় বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন হবে কমপক্ষে ২০টি আন্তর্জাতিকমানের শিপইয়ার্ড।

শতভাগ রফতানিমুখী পণ্যখাতের মধ্যে একমাত্র শিপ বিল্ডিং খাতে শুরুতে ভ্যালু এডিশনের পরিমাণের হার ৩৫ শতাংশ, যা অন্য কোনো শিল্পে হয় না। গার্মেন্টসে শুরু হয় আড়াই শতাংশ ভ্যালু এডিশন দিয়ে। ২০০৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত জাহাজ নির্মাণ খাতে বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়েছে ৫০০ কোটি টাকারও বেশি। আগামী দু'বছরের মধ্যে এ খাতে আসবে আরো সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এছাড়া এ সেক্টরে এখন যে অবকাঠামো আছে, তাতেই বছরে কমপক্ষে ১০ হাজার কোটি টাকা আয় করা সম্ভব। সরকার যদি তৈরি পোশাক রফতানিকারকদের মতো আমাদেরও সমান হারে সুবিধা দেয়, তাহলে আগামী ৫ বছরের মধ্যে এ শিপ বিল্ডিং সেক্টর থেকে বছরে ৭০ হাজার কোটি টাকা আয় করা সম্ভব।

বিশেষজ্ঞ সূত্রে জানানো হয়, নদীমুখসহ সাগরের সঙ্গে সংযুক্ত এমন এলাকাগুলোকে ঘিরে অবিলম্বে শিপ বিল্ডিং জোন প্রতিষ্ঠা করার সরকারি ঘোষণা বাস্তবায়ন জরুরি। দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে এ শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থেকে ব্যাপক অভিজ্ঞতা অর্জনকারী ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ডের এমডি সাখাওয়াত হোসেনের মতে, 'শিপ বিল্ডিংয়ে লাইট অব হোপ টু দি নেশন'।

ছোট ও মাঝারি জাহাজ নির্মাণে সম্ভাবনা বেশি : জাহাজ নির্মাণের জন্য দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, জাপান, ভিয়েতনাম ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলো আগামী ২০ বছরের জন্য নতুন অর্ডার নিতে পারছে না। এসব দেশগুলো ৩০ হাজার মেট্রিক টন ধারণ ক্ষমতার নিচে কোনো জাহাজ তৈরিতে আগ্রহী নয়। এছাড়া ইউরোপের শিল্পোন্নত দেশগুলো এখন অত্যাধুনিক সাবমেরিন নির্মাণে ব্যস্ত। বিশ্বে ছোট ও মাঝারি আকারের সমুদ্রগামী জাহাজের চাহিদা থাকায় প্রধান প্রস্তুতকারক দেশগুলোর বাইরে বিকল্প খোঁজে বিশ্বব্যাপী তৎপর ক্রেতারা। এ কারণে ব্যবসায়ীরা এখন বাংলাদেশের প্রতি ঝুঁকেছে। এ সুযোগটা কাজে লাগানোর এখনই সময়। এ সুযোগটি কাজে লাগিয়ে জাহাজ নির্মাণে আরো বেশি দক্ষতা প্রদর্শনই এখন বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত।

শিপইয়ার্ড : বাংলাদেশে বর্তমানে বেশ ক'টি জাহাজ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান কাজ করে যাচ্ছে। এগুলোর মধ্যে চট্টগ্রামের পটিয়ায় প্রতিষ্ঠিত ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড, ঢাকার মেঘনাঘাট এলাকায় আনন্দ শিপ বিল্ডার্স শীর্ষস্থানে রয়েছে। এছাড়া খান বিল্ডার্স, হাইস্পিড গ্রুপ, কর্ণফুলী শিপইয়ার্ড, খুলনা শিপইয়ার্ড, বসুন্ধরা গ্রুপসহ আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান অভ্যন্তরীণ ও সমুদ্রগামী জাহাজ নির্মাণের কাজে নিজেদের নিয়োজিত করেছে। মেড ইন বাংলাদেশ এ নামে ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক রুটে জাহাজ চলাচল শুরু করেছে। এ দেশের নির্মাণ কাজ বিশ্বমানে উন্নীত হওয়ার পর জার্মানি, ফিনল্যান্ড, ডেনমার্ক, পাকিস্তান, মোজাম্বিক, লিবিয়া ও মালদ্বীপ ইতোমধ্যে বাংলাদেশের জাহাজ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে বিভিন্ন শ্রেণীর জাহাজ নির্মাণের জন্য চুক্তিবদ্ধ ও কার্যাদেশ দিয়েছে। এর পাশাপাশি সুইডেন, দক্ষিণ কোরিয়া, নেদারল্যান্ডস এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ এ খাতে বাংলাদেশে পুঁজি বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

প্রথম সমুদ্রগামী জাহাজ রফতানি : রফতানি তালিকায় সম্ভাবনাময় নতুন পণ্য হিসেবে ২০০৮ সালের ১৫ মে সমুদ্রগামী জাহাজ রফতানি শুরু হয়। ডেনমার্কের স্টেলা শিপিং কোম্পানি প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের আনন্দ শিপইয়ার্ড অ্যান্ড শিপ ওয়েজ কোম্পানির জাহাজটি ক্রয় করে। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, প্রায় শত বছর পর আন্তর্জাতিক বাজারে গেল এ অঞ্চলের জাহাজ। এরপর অনেক জাহাজ এ দেশ থেকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রফতানি করা হয়েছে। সর্বশেষ 'গ্রোনা অ্যামারসাম' ও 'গ্রোনা বিয়েসসাম' নামে দুটি জাহাজ জার্মানির গ্রোনা শিপিং কোম্পানির কাছে বিক্রি করেছে বাংলাদেশের নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ওয়েস্টল্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড। গত ২৬ নভেম্বর চট্টগ্রাম ড্রাই ডক জেটি থেকে জাহাজ দুটি আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়।

পশ্চাৎসংযোগ শিল্পের বিকাশ : দেশে জাহাজ শিল্পের বিকাশ ঘটলে এ খাতের সংশ্লিষ্ট অনেক শিল্পের বিকাশ ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে। জাহাজ রফতানি করে একদিকে যেমন বৈদেশিক মুদ্রার আয় বাড়বে, অন্যদিকে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। সে সঙ্গে দেশে নতুন নতুন শিল্প স্থাপনের দ্বার উন্মোচন হবে। জাহাজ নির্মাণের কাঁচামালসহ আনুষঙ্গিক যেসব জিনিসের প্রয়োজন হয়, তার বেশিরভাগই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। অথচ এ শিল্পে ব্যবহৃত অনেক কিছুই দেশে প্রস্তুত করা সম্ভব। জাহাজের সাজসজ্জার জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন ধরনের আসবাবপত্র, দরজা জানালা, পোর্ট হোল, ফেয়ার লিডস, ম্যাট ল্যাডার্স, সিঁড়ি, গ্যাংওয়ে, গ্রিল, ট্রলি, নিরাপত্তা সামগ্রী মধ্যে রয়েছে লাইফ জ্যাকেট, লাইফবয়, লাইফ বোট, রেসকিউ, নেট এসব সামগ্রী দেশেই প্রস্তুত করা সম্ভব। এগুলো ছাড়াও মেরিন লাইটিং, মেরিটাইম সাইন, সিম্বল এবং পোস্টার, নোঙর ও লোহার শিকল, বিভিন্ন ধরনের মেরিন কেবল, বিভিন্ন ধরনের ইলেকট্রনিক ও ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী, সুইচগিয়ার, পিস্টন রিং, পাইপ, পাম্প, শিপ বিল্ডিং প্লেটসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্যসামগ্রী দেশীয় কারখানায় তৈরি করে উৎপাদন ও পরিবহন খরচ কমিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা সম্ভব। এছাড়া এ শিল্পের সাথে জড়িত উদ্যোক্তারা জানিয়েছে জাহাজ নির্মাণের কাঁচামালের ৯০ শতাংশই ভেঙে ফেলা জাহাজ থেকে সংগ্রহ করা হয়। বাকি ১০ শতাংশ আমদানিনির্ভর।
Source: Daily Ittefaq, 25 dec-2010

জেনে নিন:স্কাইপে

জেনে নিন:স্কাইপে

ভয়েজ চ্যাট এবং কল করার একটি অসাধারণ অ্যাপিস্নকেশন টুলস হলো স্কাইপি। এই ম্যাসেঞ্জার সফটওয়্যার ব্যবহার করে যে কেউ তার নিজের কম্পিউটার থেকে অন্য স্কাইপি ব্যবহারকারীকে ফ্রি অফ চার্জ টেলিফোন কল করতে পারবেন। এটি ব্যবহার করে সামান্য ফি দিয়ে ল্যান্ডলাইন এবং সেল ফোনেও কল করা যায়। এর মাধ্যমে আরো করা যায় ইন্সট্যান্ট ম্যাসেজিং, ফাইল ট্রান্সফার, শর্ট ম্যাসেজ সার্ভিস, ভিডিও কনফারেন্সিং ইত্যাদি। ২০০৬ সালের এপ্রিলের মধ্যে স্কাইপির রেজিস্ট্রার্ড ইউজারের সংখ্যা দাঁড়ায় ১০০ মিলিয়ন। তারা ২০০৭এর তৃতীয় কোয়ার্টারে মোট আয় করে ৯৮ মিলিয়ন ইউএস ডলার।

গোলমরিচ চাষে সাফল্য

গোলমরিচ চাষে সাফল্য

যে ক'টি কারণে পতর্ুগিজ, ফরাসি ও ইংরেজরা ভারতবর্ষে আসা শুরু করে তার মধ্যে একটি মসলা সংগ্রহ। শিল্প বিপস্নবের পর এখানে জীবনমানের প্রভূত উন্নত হওয়ার পাশাপাশি রসনার ক্ষেত্রে রুচির পরিবর্তনের কারণে মসলার চাহিদা বেড়ে যায়। সে সময় ভারতবর্ষে প্রচুর পরিমাণে মসলা উৎপাদন হলে বাংলাদেশে হত না। এখানকার মানুষ পাকিস্তান ও ভারত থেকে মসলা আমদানি করত। এখনো তাই করে। তবে আমাদের দেশে বিভিন্ন জেলাতে বর্তমানে কিছু কিছু মসলা উৎপাদন শুরু হয়েছে।

হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলা ভাদেশ্বর ইউনিয়ন খাসিয়া পুঞ্জী, যেখানে দু'শতধিক চাষি বাণিজ্যিকভাবে গোলমরিচের চাষ শুরু করেছেন। এক সময় তারা পান, আনারস ও লেবু চাষের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। এখন তারা গোলমরিচের ওপর নির্ভর করছেন। কেননা গোলমরিচ উৎপাদনে অর্থনৈতিকভাবে অনেক লাভজনক হওয়া যায়।

ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের অদূরে প্রায় ৬০ টি এলাকা জুড়ে আলীয়াছড়া খাসিয়া পুঞ্জীতে হাজার হাজার গোলমরিচের গাছ প্রকৃতিকে সাজিয়েছে ভিন্নরূপে। গোলমরিচের গাছ অনেকটা পান গাছের মত দেখতে, অন্য গাছকে অবলম্বন করে বেড়ে উঠে। স্থানীয় চাষি অরুণ খাসিয়া বলেন, অতি বৃষ্টিপাতের সময় গোলমরিচের চারা রোপণ করতে হয়। এ জন্য বছরের আষাঢ়-শ্রাবণ মাস গাছ রোপণ করার উপযুক্ত সময়। গাছে ফল ধরতে সময় লাগে প্রায় ৪ বছর। তখন প্রতিটি গাছ থেকে ৩ কেজি পর্যন্ত গোলমরিচ পাওয়া যায়, ফল পাকার পর ছিড়ে নিয়ে রোদে শুকাতে হয়। এরপর বাজারজাত করতে হয়। এখানকার ফলের মানও ভাল।

গোলমরিচ চাষের পাশাপাশি একই সাথে সুপারিরও চাষ করা যায়। এতে যত্ন বা পরিচর্যার তেমন একটা প্রয়োজন পড়ে না। বাজারে এর অনেক চাহিদা থাকায় বেশ ভাল দামে বিক্রি করছেন তারা। এতে বছরে মোটা অংকের টাকা উপার্জন হচ্ছে।

হবিগঞ্জ জেলার কৃষি সমপ্রসারণ অধিদফতরে উপ-পরিচালক জালাল উদ্দিন জানান, বাংলাদেশে প্রচুর পরিমাণে গোলমরিচ আমদানি হয়। দেশে যে পরিমাণ পাহাড়ি জমি রয়েছে তাতে গোলমরিচসহ অন্য মসলা উৎপাদন করা সম্ভব। বিশেষ করে হবিগঞ্জের মাটি ও পরিবেশ মসলা চাষের উপযোগী। চাষিরা ব্যাপকভাবে গোলমরিচসহ অন্যান্য মসলা উৎপাদন করতে চাইলে সরকারের কৃষি সমপ্রসারণ বিভাগ যেকোনো সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।

শাহ ফখরুজ্জামান, হবিগঞ্জ

সৌদি খেজুরের অর্থকরী ও পরিবেশগত দিক

সৌদি খেজুরের অর্থকরী ও পরিবেশগত দিক

আমাদের দেশে যে খেজুর দেখা যায় তা বুনো বা পাতি খেজুর। বুনো খেজুরের বীজ থেকে সহজেই চারা গজায়। খোরমা খেজুরের বীজ থেকে সহজে চারা গজায় না বলে আমাদের দেশে খোরমা খেজুরের বিস্তৃৃতি হয়নি এবং খেজুর চাষ যে বহুমুখী অর্থকরী ফসল তা কখনো কেউ বিবেচনায় আনেনি। সকলের একটি বদ্ধমূল ধারনা খেজুর মরুর দেশের ফসল। আসলে ধারনাটি সত্যি নয়, খেজুর উষ্ণ মণ্ডলীয় ফল এবং মরুর দেশের চাইতে আমাদের দেশে খেজুরের ফলন অধিক হবে পাশাপাশি ফলের মান হবে উন্নত। আর এর পেছনের কারণ হিসেবে কাজ করছে পানির প্রাপ্যতা। খেজুরই একমাত্র ফল যা স্বাভাবিকভাবে ৩ থেকে ৪ বছর সংরক্ষণ করা যায় আর তাই বিকল্প খাদ্য হিসেবে খেজুরের গুরুত্ব্ব অপরিসীম। চিনি: খেজুর ফলে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ চিনি থাকে তাই খেজুর পরিশোধন করে চিনি উৎপাদন করা যায়। রস: নারী-পুরুষ উভয় প্রকার খেজুর গাছ থেকে রস আহরণ করা যায়, যা থেকে সহজেই বিভিন্ন দ্রব্যাদি প্রস্তুত করা যায়- ক) রাব; খ) গুড়; গ) চিনি; ঘ) ডরহব; ঙ) অষপড়যড়ষ; চ) অপবঃরপ ধপরফ বা ভিনেগার (প্রাকৃতিক)। কাগজ: খেজুর গাছের পাতা বিভিন্ন প্রকার মণ্ড ও কাগজ তৈরির এক উত্তম উপকরণ। কারণ এতে রয়েছে উচ্চ মাত্রার আলফা সেলুলোস (৫০-৫০%) ও হেমিমেলুলোস (২৬-৩০%)। অাঁশের দৈর্ঘ্য ১.২৫ মিঃ থেকে ২.৫ মি. মি. পর্যন্ত হয়। তাই খেজুর পাতা দিয়ে কাগজ তৈরিতে কোনো প্রকার সিন্থেটিক পলিমার যোগ করার প্রয়োজন হয় না। এই কাগজ ১০০ ভাগ পরিবেশবান্ধব। মাটিক্ষয় রোধ: খেজুর গাছের রয়েছে প্রকাণ্ড মূলতন্ত্র যা সোজা ও আড়াআড়িভাবে প্রায় ৫০ ফুট এবং মাটির গভীরে যায় ৭০ ফুট। পাশাপাশি অনেক খেজুর গাছ থাকলে সেগুলোর মূল মাটির গভীরে পরস্পর আড়াআড়িভাবে এক ধরনের জাল সৃষ্টি করে যা মাটি ধরে রাখতে সহায়তা করে। ঝড় ও জলোচ্ছ্বাস প্রতিরোধ: বিশাল ও মজবুত মূলতন্ত্রের কারণে খেজুর গাছ তীব্র ঝড় প্রতিরোধ করতে পারে। ঝড়ের তীব্রতা কমাতে উপকূলীয় এলাকায় খেজুরের বনাঞ্চল সৃষ্টি করে সিডোর আইলা ইত্যাদির মত ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা অনেক কমিয়ে দেয়। সমপ্রতি যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ফ্লোরিডার উপর দিয়ে বয়ে গেছে ঘূর্ণিঝড় হারকেন এন্ড্রিউ। সেখানে তীব্র ঝড়ের পর যে ক'টি গাছ দাঁড়িয়েছিল তার প্রায় সবগুলোই ছিল পাম জাতীয় গাছ এবং তার অন্যতম ছিল খেজুর গাছ। মরুকরণ প্রতিরোধ: অন্য যেকোনো গাছের তুলনায় খেজুর গাছ মাটির গভীর থেকে অধিক পরিমাণে পানি শোষণ করে উপরে তুলে আনে বলে পানির স্তর নিচে নামতে পারে না।

ডাঃ মনজুর ইকবাল, ফেনী

Sunday, January 2, 2011

ঘুড়ির দুনিয়া

ঘুড়ির দুনিয়া আমিন রহমান নবাবঘুড়ি ওড়ানোর মধ্যে রয়েছে এক অন্যরকম আনন্দ। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই ঘুড়ি ওড়ানো একটি জনপ্রিয় খেলা। তবে ঘুড়ি শুধুই যে ছোটরা ওড়ায় তা কিন্তু নয়, বড়রাও ঘুড়ি উড়িয়ে থাকেন।
ঘুড়ির আবিষ্কার হয়েছিল কোথায়? কে এই সুন্দর খেলার বস্তুটি আবিষ্কার করেছিলেন? তা সঠিকভাবে জানা যায় না। তবে শোনা যায় ৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে গ্রিসের ট্যারাস্টাস শহরের আর্কিটাস নামে এক ভদ্রলোক প্রথম ঘুড়ি তৈরি করেছিলেন। আবার কেউ কেউ মনে করেন ২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে হান সিন নামে চীন দেশের এক সেনাপতিই প্রথম ঘুড়ি তৈরি করেন। আগে সিল্ক কাপড় দিয়ে ঘুড়ি তৈরি হতো। কাগজ আবিষ্কারের পর কাগজের ঘুড়ি তৈরি শুরু হয়।
ইউরোপ বা আমেরিকায় ঘুড়ি ওড়ানোর রেওয়াজ থাকলেও চীন, জাপান, কোরিয়া, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়ার মতো পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতেই এই খেলার জনপ্রিয়তা বেশি। যদিও আকাশ পরিষ্কার থাকলে ও অনুকূল বাতাস পেলেই ঘুড়ি ওড়ানো যায়, তবুও পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই একটি বিশেষ দিনকেই ঘুড়ি দিবস হিসেবে পালন করা হয়ে থাকে। এদিন সবচেয়ে বেশি ঘুড়ি আকাশে উড়তে দেখা যায়। সবাই এই বিশেষ দিনটির কথা ভেবেই যেন নিজেদের প্রস্তুত করতে থাকেন।
চীন দেশে ঘুড়ি দিবসের দিন সব বয়সের নারী ও পুরুষ ঘুড়ি উড়িয়ে থাকেন। বিচিত্র বর্ণের, বিচিত্র আকারের অসংখ্য ঘুড়ি সারা আকাশ রাঙিয়ে তোলে। ওদেশের ঘুড়িগুলোর রং ও আকার আমাদের দেশের ঘুড়ির চেয়ে অনেক বেশি বৈচিত্র্যপূর্ণ। রংবেরংয়ের সুন্দর মাছ, প্রজাপতি, ড্রাগন, পাখি, মানুষ, পরী, জাহাজ ইত্যাদি প্রায় তিনশ রকমের ঘুড়ি আকাশে উড়তে দেখা যায়। আর সবচেয়ে মজার ঘুড়ি হলো লণ্ঠন ঘুড়ি। রাতেরবেলায় এই ঘুড়ির মধ্যে লণ্ঠন বসিয়ে ওড়ানো হয়। আমাদের দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এরকমই বিভিন্ন ঘুড়ি দিবসে ঘুড়ি ওড়ানো হয়। প্রতিবছর পুরান ঢাকায় সাকরাইন উৎসবে ঘুড়ি ওড়ানো অন্যতম একটি অনুষঙ্গ। বিচ্ছিন্নভাবে সারা দেশে নিয়মিতই চলে ঘুড়ির উৎসব। ঢাকায় কিছু সংস্কৃতিসেবী প্রতিষ্ঠান কয়েক বছর ধরে ঘুড়ি উৎসবের আয়োজন করে আসছে।
আমাদের দেশের ঘুড়ি এবং ভারতীয় ঘুড়ির মধ্যে খানিকটা মিল রয়েছে। তবে অনেক ক্ষেত্রে ভারতের একাধিক প্রদেশে অভিনব রকমের ঘুড়ির দেখা মেলে। এসব ঘুড়ির সঙ্গে মালয়েশিয়ার ঘুড়ির কিছু মিল দেখতে পাওয়া যায়। পশ্চিমবঙ্গে দুইটি কাঠি দিয়ে তৈরি বর্গাকৃতির ঘুড়ি যার আকারগত কোনো বৈচিত্র্য লক্ষ করা যায় না। কেবল নানা রংয়ের কাগজ দিয়ে বিভিন্ন ডিজাইনে তৈরি করা হয়ে থাকে। ডিজাইন মতো তাদের বিভিন্ন নামে ডাকা হয়, যেমন চাঁদিয়াল, ঢুপিয়াল, ঘয়লা, চৌরঙ্গি ইত্যাদি। ভারতবর্ষের অন্যত্র বিভিন্ন দেশের নেতা বা সিনেমার নায়কদের ছবি ঘুড়িতে লাগিয়ে ওড়ানো হয়ে থাকে।
উপমহাদেশে মুসলিম শাসনামলে বিভিন্ন সময়ে নানা রকমের ঘুড়ি দেখা গেছে। যেমন কানকাওয়া, চংগ, তুলকল, পতংগ, গুড্ডি প্রভৃতি। এসব ঘুড়ি তৈরি করা ছিল যেমন শ্রমসাধ্য তেমনি খরচ সাপেক্ষ। দিলি্লর রাজা শাহ আলমের আমল থেকেই ঘুড়ি ওড়ানোটা ভারতবর্ষে খেলা হিসেবে মনে করা হয়। নবাবী আমল ছিল পেশাদার ঘুড়ি উড়িয়েদের সুবর্ণ যুগ। তখন ঘুড়ি ওড়ানোর ওপর বাজি ধরা হতো যা হতো উড়িয়েদের প্রাপ্য।
ঘুড়ির প্যাঁচ বা কাইট ফাইটিং প্রায় সব দেশেই খেলা হয়ে থাকে। তবে এ ব্যাপারে সবচেয়ে মাতামাতি হয় থাইল্যান্ডে। ওখানে ঘুড়ির লীগ প্রতিযোগিতা হয়। শীতকালে এ ধরনের প্রতিযোগিতা দেখা যায়।
ঘুড়ি ওড়ে কিভাবে? ঘুড়িতে সুতো দিয়ে মাটি থেকে নিচের দিকে টান দেওয়া হয়। আর ঘুড়ির ওপর উর্ধ্বমুখী কাজ করে বাতাসের আকর্ষণ শক্তি। এই দুটি টান যতক্ষণ সমান থাকে ততক্ষণ ঘুড়ি আকাশে উড়তে পারে। শুধু খেলার সামগ্রী হিসেবে পরিচিত হলেও অনেক সময়ে এই ঘুড়িই বিজ্ঞানের নানা গবেষণায় সাহায্য করেছে। যেমন ১৭৪৯ সালে আলেকজান্ডার উইলসন ঘুড়িতে থার্মোমিটার লাগিয়ে ঊর্ধ্বাকাশের তাপমাত্রা নির্ণয়ের চেষ্টা করেছিলেন। ১৯০১ সালের ১২ ডিসেম্বর ঘুড়ির মধ্যে অ্যান্টেনা লাগিয়ে নিউফাউন্ডল্যান্ডের বৈজ্ঞানিক মার্কনি আকাশের ইলেকট্রোম্যাগনেটিভ ওয়েভ ধরতে সক্ষম হয়েছিলেন। ১৭৫২ সালে বিজ্ঞানী বেঞ্জামিন ফ্র্যাংকলিন আকাশে একটি সিল্কের ঘুড়ি উড়িয়ে তার সাহায্যে কৃত্রিমভাবে প্রস্তুত বিদ্যুৎ ও আকাশের বিদ্যুৎ যে এক তা প্রমাণ করেছিলেন। যুদ্ধের নানা কাজেও ঘুড়ি ব্যবহার করা হয়েছে পৃথিবীর নানাপ্রান্তে।