Wednesday, January 19, 2011

বাংলাদেশে গভীর সমুদ্রবন্দর

বাংলাদেশে গভীর সমুদ্রবন্দর
মাহবুব রেজা, by সাপ্তাহিক ২০০০, 2 ডিসেম্বর 2010

সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চলের দেশগুলোর অর্থনীতির জন্য সমুদ্রবন্দর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রাচীনকাল থেকে তাই সেসব অঞ্চলে গড়ে উঠেছে সমুদ্রবন্দর। এভাবেই চলে আসছিল। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মানুষ এগিয়েছে। প্রযুক্তির বদল হয়েছে। বাণিজ্যের গতি-প্রকৃতিরও ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। বর্তমান পৃথিবীর মুক্তবাজার অর্থনীতিতে যুক্ত হয়েছে পরিবর্তনের নানান মাত্রা। পৃথিবীর দেশে দেশে সেই পরিবর্তনের ধাক্কা এসে লেগেছে। এই পরিবর্তনের হাত ধরে গভীর সমুদ্রবন্দর একটি বড় ইস্যু হিসাবে দেখা দিয়েছে। অর্থনীতি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গভীর সমুদ্রবন্দর একটি দেশের সামগ্রিক চেহারাই বদলে দিতে পারে।
ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর কাছে গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গোপসাগর সেই গুরুত্বকে আরো নানাভাবে বাড়িয়ে তুলেছে। একটা সময় ছিল যখন চট্টগ্রাম বন্দরকে ব্যবহার করে আশপাশের দেশের মানুষজন তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করত। আশির দশকেও নেপালের ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যে চট্টগ্রাম বন্দরকে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ব্যবহার করত। পরবর্তী সময়ে অজ্ঞাত কারণে নেপাল চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। তবে বন্দর ব্যবহারে নেপালের এই সরে যাওয়াকে দেশের বন্দর-সম্পর্কিত অভিজ্ঞজনরা ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তারা বলছেন, চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর ক্রমাগতভাবে চাপ বেড়ে যাওয়া এবং একই সঙ্গে প্রাকৃতিকভাবে কর্ণফুলীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় বন্দরের প্রতি ব্যবহারকারীদের আগ্রহ কমে যাচ্ছে। ব্যবসা-বাণিজ্যে সময় বাঁচানোকে অগ্রাধিকার দিয়ে বন্দর ব্যবহারকারীরাও চান আমদানি-রফতানিতে গতি আসুক। ব্যবসা বাণিজ্য তথা অর্থনৈতিক উন্নয়ন অব্যাহত থাকুক।
চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্রবন্দর দেশের গুরুত্বপূর্ণ আমদানি-রফতানি অবকাঠামো। দেশের সিংহভাগ আমদানি-রফতানি বাণিজ্য সম্পাদিত হয় এই দুই বন্দরের মাধ্যমে। তবে চট্টগ্রাম বন্দরকে দেশের লাইফ লাইন হিসাবে উল্লেখ করা হয়। এ বন্দরের মাধ্যমে বাংলাদেশের আমদানি-রফতানির তিন-চতুর্থাংশ সম্পাদিত হয়। বাকিটুকু হয় মংলা ও কয়েকটি স্থলবন্দরের মাধ্যমে। চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরের অবস্থান এমন যে এই দুই বন্দরে বৃহদাকারের কোনো জাহাজ ভিড়তে পারে না। বন্দর সংশ্লিষ্টরা জানান, নাব্যতা, প্রাকৃতিক কাঠামো এর অন্তরায়। যার ফলে আমদানি রফতানিকারকদের অনেকটা বাধ্য হয়ে সিঙ্গাপুর বন্দর ব্যবহার করতে হয়। আমদানি রফতানির ক্ষেত্রে বৃহদাকার জাহাজ চট্টগ্রামের পরিবর্তে সিঙ্গাপুর বন্দরে ভেড়ে। সিঙ্গাপুরে পণ্যবাহী এসব জাহাজ এসে ভিড়লে সেখান থেকে অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্রাকৃতির জাহাজে করে মাল চট্টগ্রামে আনতে হয়। একইভাবে মাল পাঠানোর ক্ষেত্রেও চট্টগ্রাম থেকে ক্ষুদ্রাকৃতির জাহাজে করে সিঙ্গাপুর পাঠাতে হয়। উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সিঙ্গাপুর বন্দরের দূরত্ব বারোশ কিলোমিটার। এই প্রক্রিয়ার কারণে আমদানি ও রফতানিকারকদের অতিরিক্ত ব্যয়ের সম্মুখীন হতে হয় এবং পণ্যমূল্যের ওপর তার বিরূপ প্রভাব পড়ে। যার ফলে ভোক্তার ওপর চাপ পড়ে। দ্রব্যমূল্য ঊর্ধ্বগামী হয়। ব্যবসায়ী মহল দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির পেছনে একে একটি বড় কারণ বলে উল্লেখ করছেন।
বর্তমানে অর্থনৈতিক যুদ্ধে বিশ্ববাজারে টিকে থাকার জন্য দীর্ঘদিন ধরে অভিজ্ঞজনরা বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে এদেশে একটি গভীর সমুদ্রবন্দরের স্বপ্ন দেখছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মিত হলে শুধু যে বাংলাদেশই উপকৃত হবে তা নয়, এই বন্দরকে কেন্দ্র করে প্রতিবেশী দেশগুলো সুবিধাপ্রাপ্ত হবে। পাশাপাশি আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও সমৃদ্ধি লাভ করবে।
কবে থেকে বাংলাদেশে গভীর সমুদ্রবন্দর তৈরির স্বপ্ন, চিন্তাভাবনার সূত্রপাত ঘটেছিল? জানা যায়, ষাটের দশকে নৌবাহিনীর তৎকালীন ক্যাপ্টেন এমএল রহমান তার ব্যক্তিগত উদ্যোগে সর্বপ্রথম জরিপ চালিয়ে কুতুবদিয়া চ্যানেলে গভীর সমুদ্রবন্দর তৈরির প্রস্তাব করেছিলেন এবং সেই জরিপের তথ্য ও উপাত্ত অনুযায়ী তিনি সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের কাছে একটি পরিকল্পনাও পেশ করেছিলেন। দীর্ঘ চার দশক অতিক্রম হলেও গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা থেকে বাংলাদেশ পিছিয়ে ছিল। তবে বিশিষ্ট পোতাশ্রয় ও সমুদ্রবন্দর বিশেষজ্ঞ এমএল রহমান সে সময় যখন গভীর সমুদ্রবন্দর নিয়ে জরিপের কাজ করছিলেন তখন অভিজ্ঞজনরা তাদের মতামত ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেছিলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর ক্রমাগতভাবে চাপ বৃদ্ধি পাওয়া এবং কর্ণফুলীর নাব্যতা প্রাকৃতিকভাবে কমে যাওয়ায় চ্যানেলে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ জরুরি হয়ে পড়েছে।
স্বাধীনতার পর গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ বিষয়টি অত জোরালভাবে কখনো আসেনি। তবে নব্বই পরবর্তী বিভিন্ন সরকারকে গভীর সমুদ্রবন্দর বিষয়টি নিয়ে কথাবার্তা বলতে শোনা গেলেও কার্যক্ষেত্রে কোনো সরকারই এ ব্যাপারে সক্রিয় ভূমিকা রাখেনি। দীর্ঘসময় ধরে ভোট আর কথামালার রাজনীতিতে চাপা পড়ে থাকে গভীর সমুদ্রবন্দর বাস্তবায়নের পরিকল্পনা।
জানা যায়, স্বাধীনতার পর চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরের অপর্যাপ্ত ক্ষমতা উপলব্ধিতে এনে গভীর সমুদ্রবন্দর স্থাপনে তৎকালীন সরকার একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করে। তখন একটি দেশি প্রতিষ্ঠান গভীর সমুদ্রবন্দরের সম্ভাব্যতা যাচাই করে সাতটি এবং ১৯৭৬-৭৭ সালে একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান তিনটি স্থানকে প্রাথমিকভাবে বন্দর নির্মাণের জন্য উপযুক্ত বলে চিহ্নিত করে। ওই জরিপের আলোকে ১৯৮৩ সালে ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক ও কারিগরি দিক বিবেচনা করে মহেশখালীর দক্ষিণ-পশ্চিম চ্যানেলকে (সোনাদিয়া চ্যানেল) বন্দর নির্মাণের জন্য অধিকতর উপযুক্ত স্থান হিসাবে নির্ধারণ করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৮৪ সালে বিশিষ্ট পোতাশ্রয় ও সমুদ্রবন্দর বিশেষজ্ঞ এমএল রহমান এ ব্যাপারে সরকারকে তার জরিপের যাবতীয় তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেন।
চারদলীয় জোট সরকারের সময়ে ২০০৫ সালের শেষ দিকে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য জাপানি পরামর্শক সংস্থা প্যাসিফিক কনসালট্যান্ট ইন্টারন্যাশনালকে (পিসিআই) নিয়োগ করা হয়। নিয়োগকৃত পরামর্শক প্রতিষ্ঠানটিকে ২০০৬ সালের আগস্ট থেকে ২০০৭ সালের আগস্ট পর্যন্ত এক বছর সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়। ২০০৫ সালের শেষের দিকে ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভায় কমিটিতে কনসালট্যান্ট নিয়োগের প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। ২০০৬ সালের ১২ জুলাই পিসিআই-এর সঙ্গে সরকারের একটি চুক্তি স্বাক্ষর হয়। সে সময় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে স্থান নির্বাচনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের অনুমোদিত ব্যয় ধরা হয় ১৭ কোটি ৪৮ লাখ টাকা।
প্যাসিফিক কনসালট্যান্ট ইন্টারন্যাশনালের প্রাথমিক সমীক্ষা শেষে জাপানি বিশেষজ্ঞরা বঙ্গোপসাগরের সোনাদিয়াকে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে উপযুক্ত স্থান হিসাবে সুপারিশ করে। সরকার নির্ধারিত ৯টি ক্রাইটেরিয়ার ভিত্তিতে এই সমীক্ষায় যেসব বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে তা হলো পানির গভীরতা, ইনল্যান্ড কানেক্টিভিটি এবং ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম। জানা যায়, পরামর্শক প্রতিষ্ঠান প্যাসিফিক কনসালট্যান্ট ইন্টারন্যাশনালের বিশেষজ্ঞরা বঙ্গোপসাগরের পতেঙ্গা, পতেঙ্গা মিডল আইল্যান্ড, কুতুবদিয়া চ্যানেল, সোনাদিয়া, সেন্টমার্টিন, সুন্দরবনের এলিফেন্ট পয়েন্ট এবং আকরাম পয়েন্টে তাদের সমীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করেন। প্রাথমিক পর্যায়ে সমীক্ষা শেষে তারা সোনাদিয়াকে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে উপযুক্ত স্থান বলে চিহ্নিত করার পেছনে যেসব বিষয়কে জাপানি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান গুরুত্ব দিয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সেখানকার পানির গভীরতা ১৪ মিটার যা বৃহদাকার মাদার ভেসেল ভেড়ার জন্য উপযোগী। পাশাপাশি ওই স্থানে পলি জমার পরিমাণ শূন্যের কোটায় হওয়ার কারণে একদিকে নেভিগেশনে যেমন কোনো সমস্যা হবে না তেমনি বছর বছর ড্রেজিং খাতেও বিশাল অঙ্কের অর্থেরও সাশ্রয় হবে। তাছাড়া ইনল্যান্ড কানেক্টিভিটিও সোনাদিয়ার ক্ষেত্রে বেশ সহজ এবং পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক স্থাপন অত্যন্ত সহজ বলে বিভিন্ন সূত্র জানায়।
সূত্র মতে, জাপানি বিশেষজ্ঞরা সোনাদিয়ার পরে কুতুবদিয়া চ্যানেলকে গভীর সমুদ্রবন্দরের জন্য দ্বিতীয় অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত উপযুক্ত স্থান বলে চিহ্নিত করেছেন। তবে এক্ষেত্রে কুতুবদিয়ায় পলি জমার পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে বেশি হওয়ায় একদিকে ড্রেজিং খাতে বছর বছর বিপুল পরিমাণ অর্থের ব্যয় হবে অন্যদিকে কুতুবদিয়ার নেভিগেশন ঠিক রাখার জন্য প্রায় ২০০ মিটার চ্যানেল কেটে ঠিক রাখার ঝামেলাও রয়েছে। এ ছাড়া কুতুবদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করতে গেলে সেখানকার বিপুল জনগোষ্ঠীকে এলাকা ছাড়তে এবং সে বাবদ সরকারকে ভূমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণে বিপুল অঙ্কের অর্থ প্রদান করতে হবে। সোনাদিয়ার ক্ষেত্রে ভূমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণের বিষয়টি থাকবে না। সবদিক দিয়ে বিচার বিশ্লেষণ করে সোনাদিয়াকেই চূড়ান্তভাবে বন্দর নির্মাণের উপযুক্ত স্থান বলে চিহ্নিত
করা হয়।
চারদলীয় জোট সরকারের ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়লে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের বিষয়টি আবারও পর্দার আড়ালে চলে যায়। ওয়ান-ইলেভেনের পটপরিবর্তনের ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় এলে নতুন করে আবার গভীর সমুদ্র বন্দরের বিষয়টি সামনে চলে আসে। তারই ধারাবাহিকতায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীন আহমদ উপদেষ্টা পরিষদের সর্বশেষ নিয়মিত সাপ্তাহিক বৈঠকে গভীর সমুদ্রবন্দর স্থাপন প্রকল্পটি আলোচনার জন্য এজেন্ডাভুক্ত করা হয়।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পর ২০০৮ সালের নির্বাচনে মহাজোট ক্ষমতায় এলে গভীর সমুদ্রবন্দরের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হয়। অবশ্য মহাজোটের নির্বাচনী ইশতেহারেও গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের প্রসঙ্গটি ছিল। ফলে এ বন্দর নির্মাণে মহাজোট দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে পার্শ্ববর্তী দেশসহ অনেক দেশই তাদের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এই বন্দর নির্মাণে ভারত, চীনসহ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ আগ্রহ পরিলক্ষিত হয়েছে। ডিপ-সি পোর্ট প্রজেক্ট নামে তিন পর্বের প্রকল্প বাস্তবায়িত সম্পন্ন হবে ২০৫৫ সালে। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ২০১১ সালের জানুয়ারি মাস থেকে প্রথম পর্বের কাজ শুরু হবে। প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৬০ হাজার কোটি টাকা। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব জানান, ইতিমধ্যে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের জন্য প্রথম দফায় ১৫ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প এডিপিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বন্দর নির্মাণে মোট ব্যয়ের ৩০ শতাংশ অর্থের জোগান দেবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। বাকি ৭০ শতাংশ সরকারি-বেসরকারি অংশগ্রহণে (পিপিপি) সংস্থান হবে বলে তিনি জানান।
সূত্র জানায়, গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে পরামর্শক নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। পরামর্শক নিয়োগের পর শুরু হবে বন্দর নির্মাণে মূল নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান নিয়োগের প্রক্রিয়া। সুবিশাল এ প্রকল্পের জন্য উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নিতে মন্ত্রণালয় থেকে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগকে (ইআরডি) চিঠি লেখা হয়েছে। ইআরডি সূত্র জানিয়েছে, তারা ইতিমধ্যে অর্থ সংগ্রহের কাজ শুরু করে দিয়েছে। এ ছাড়া দুটি চীনা প্রতিষ্ঠান বন্দর নির্মাণে তাদের আগ্রহের কথা জানিয়েছে। চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে তারা নৌপরিবহনমন্ত্রীর সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা করেছেন। তবে এখন পর্যন্ত কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাওয়া যায়নি। নৌপরিবহন সচিব আরো জানান, চীনের অর্থনৈতিক সামর্থ্যরে বিবেচনায় এ প্রকল্পটি তাদের জন্য কিছুই নয়। উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক সময়ে ওই চীনা প্রতিষ্ঠান দুটি সাংহাইয়ের কাছে সমুদ্রের মধ্যে ৩৩ কিলোমিটার দীর্ঘ ও টেকসই সেতু নির্মাণ করে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করেছে, যা বিশ্বে প্রশংসিত।
অন্যদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, অর্থনৈতিক সহযোগিতা চুক্তির আওতায় বাংলাদেশকে ৪০ কোটি ইউয়ান অনুদান দেওয়ার কথা জানিয়েছে চীন। তবে চীন গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের অনুদান দেওয়ার কথা স্পষ্ট করে জানায়নি। প্রধানমন্ত্রীর সর্বশেষ চীন সফরেও এ বিষয়ে দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ে কথা হয়েছে। এরপর চীনের একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল ঢাকায় এসে এ ব্যাপারে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা করেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র থেকে জানা যায়, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, নেদারল্যান্ডসসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশ, বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বিভিন্ন পর্যায়ে সহায়তা দেওয়ার জন্য পরিকল্পনা, অর্থ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব পাঠিয়েছে।
এর আগে নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের নেতৃত্বে একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল চীনের ইয়াংসান ও সাংহাই, মালয়েশিয়ার পেনং ও কেলাং, ভারতের মুম্বাই ও চেন্নাই এবং হংকং বন্দরের সামগ্রিক নির্মাণ কৌশল, তথ্য ও ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি পর্যবেক্ষণ করে। নৌপরিবহনমন্ত্রীর নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলের বিশেষজ্ঞ দল পর্যালোচনা, বিশ্লেষণ ও যাচাই-বাছাই শেষে চীনের ইয়াংসান গভীর সমুদ্রবন্দরকে বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রবন্দরের মডেল হিসাবে আপাতত চূড়ান্ত করেছেন বলে জানা যায়।
নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব জানান, বন্দর নির্মাণে বিশেষ প্রতিষ্ঠান নিয়োগের প্রাক-যোগ্যতা যাচাই পর্ব শেষ করে চলতি বছরেই কার্যাদেশ দেওয়া হবে। কার্যাদেশপ্রাপ্তির পর যাবতীয় প্রক্রিয়া শেষে আগামী বছরের জানুয়ারি মাসে বন্দরের নির্মাণ প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে তিনি জানান।
জানা যায়, মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে বন্দরের কার্যপরিধি এবং পূর্ণাঙ্গ নকশা তৈরির প্রক্রিয়া শেষ করেছে। কার্য পরিধিতে রয়েছে বন্দর ও জেটির অবকাঠামো নির্মাণ, অতিরিক্ত চ্যানেল তৈরি, আমদানি ও রফতানির জন্য নির্ধারিত স্থান, সড়ক ও রেলপথে যোগাযোগ, অভ্যন্তরীণ নদীবন্দরের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা, ট্রানজিট এলাকা, টাউনশিপ, হেলিপ্যাড, দুর্যোগের সময় নিরাপদ অঞ্চল এবং গ্যাস ও বিদ্যুতের জন্য কেন্দ্র নির্মাণ। পাশাপাশি এতে বন্দর তৈরির জন্য জমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসনের বিষয়টিও সংযুক্ত আছে।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় জানায়, বন্দর নির্মিত হবে তিন পর্বে। প্রথম পর্বের কাজ শুরু হবে আগামী বছরের জানুয়ারিতে। শেষ হবে ২০২০ সালে। তবে মন্ত্রণালয় থেকে প্রথম পর্বের কাজ যাতে ২০১৬ বা ২০১৭ সালের মধ্যে শেষ করা যায় সে লক্ষ্যে কাজ করে যেতে নির্মাণ প্রতিষ্ঠানকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম পর্বের কাজ শেষ হলে ১১টি জেটি-বার্থের মাধ্যমে বন্দরের বাণিজ্যিক পরিচালনা চালু করা সম্ভব হবে। ২০২০ সালে দ্বিতীয় পর্বের কাজ শুরু হয়ে ২০৩৫-এ বন্দরে যোগ হবে আরো ২৫টি জেটি-বার্থ। তৃতীয় পর্বের কাজ ২০৩৫ সালে শুরু হয়ে শেষ হবে ২০৫৫ সালে। বন্দরের কাজ শেষ হলে মোট জেটির সংখ্যা দাঁড়াবে ৯৬টিতে। তখন গভীর সমুদ্রবন্দরে একসঙ্গে ৯৬টি জাহাজ নোঙর করে একসঙ্গে পণ্য ওঠানো-নামানোর কাজ সম্ভব হবে।
সংশ্লিষ্ট গবেষকরা বলছেন, গভীর সমুদ্রবন্দরের প্রথম পর্বের কাজ শেষ হলে দেশের অর্থনীতি এক দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি পাবে। এ ছাড়া আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে ১৮ থেকে ৩০ ভাগ পরিবহন ব্যয় কমে যাবে। যার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে দ্রব্যমূল্যে। মানুষ উপকৃত হবে।
সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে মহেশখালী দ্বীপের প্রায় সাত বর্গমাইল এলাকাজুড়ে গড়ে তোলা হবে নয়নাভিরাম উপশহর, যেখানে আমদানি-রফতানি ও বন্দর সংশ্লিষ্ট যাবতীয় কাঠামো গড়ে তোলা হবে। মহেশখালী থেকে রামু হয়ে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক পর্যন্ত সুপ্রশস্ত সড়ক ও দোহাজারি থেকে মহেশখালী পর্যন্ত প্রায় ৬০-৭০ কিলোমিটার রেললাইন স্থাপন করা হবে। ঢাকামুখী কনটেইনার ও পণ্যসামগ্রী নদীপথে পরিবহনের সুবিধার্থে ইতিমধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের অর্থায়নে বুড়িগঙ্গার পাশে পানগাঁও এলাকায় একটি অভ্যন্তরীণ পণ্যাগার (আইসিডি) গড়ে তোলা হয়েছে।
বন্দরের সম্ভাব্যতা যাচাইকারী জাপানের প্যাসিফিক ইন্টারন্যাশনালের সমন্বয়ক কেএম আহমেদ জানান, বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দর ১০ লাখ টন কনটেইনার হ্যান্ডলিং করে। আর গভীর সমুদ্রবন্দরের প্রথম পর্বের কাজ শেষ হলে সাত কোটি ৪১ লাখ টন কনটেইনার ওঠানামা করতে পারবে। ২০৫৫ সালে চূড়ান্ত নির্মাণকাজ শেষ হলে কনটেইনার ওঠানামার পরিমাণ দাঁড়াবে ৩২ কোটি ৫২ লাখ টন। তিনি আরো জানান, ৩শ মিটারের প্রতিটি বার্থে হারবার হবে ছয়টি। প্রতিটি হারবারে একসঙ্গে পণ্যবাহী পাঁচটি ও কনটেইনারবাহী চারটি জাহাজ প্রবেশ করতে পারবে, যা এখনকার নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের চেয়ে তিনগুণ
বড় হবে।
এ প্রসঙ্গে নৌপরিবহনমন্ত্রী জানান, গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের বিষয়টি মহাজোটের নির্বাচনী ইশতেহারে ছিল, যার কারণে আমরা এই বন্দর নির্মাণে সার্বক্ষণিক নজর রাখছি। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এর নির্মাণকাজ শুরু হবে।
গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মিত হলে বাংলাদেশ ছাড়াও ভারতের হলদিয়া ও কলকাতা বন্দরের পণ্য, ভারতের উত্তরাঞ্চলের সাতটি রাজ্যের আমদানি-রফতানি স্বল্প খরচে ও কম সময়ে আনা-নেয়ায় সুবিধা হবে। এ ছাড়া মিয়ানমার ও চীনের ইউনান প্রদেশের পণ্যসামগ্রী পরিবহনের কাজে এই গভীর সমুদ্রবন্দরকে সহজে ব্যবহার করা যাবে। এসব সুবিধাপ্রাপ্তির জন্য চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে উল্লিখিত দেশগুলো বহুবার সুপারিশ করেছে। এ ছাড়া পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনেও বন্দর ব্যবহারের ফলে এসব সুবিধার সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান দেখানো হয়েছে।

গভীর সমুদ্রবন্দর হবে সোনাদিয়াতেই
শাজাহান খান, নৌপরিবহনমন্ত্রী

সাপ্তাহিক ২০০০ : বর্তমানে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ কোন পর্যায়ে আছে এবং অর্থনীতিতে তা কী ধরনের প্রভাব ফেলবে?
শাজাহান খান : সোনাদিয়াতে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের প্রক্রিয়া এগিয়ে চলেছে। ইতিমধ্যে সমীক্ষা চালিয়ে পারিপার্শ্বিক অবস্থা জানা হয়েছে। আনুষঙ্গিক বিষয় পর্যবেক্ষণ করে জাপানি বিশেষজ্ঞ দল স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে, গভীর সমুদ্রবন্দর সোনাদিয়াতেই তৈরি করা হবে। ইতিমধ্যে সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করার ব্যাপারে অনুদান ও ঋণের ক্ষেত্রে সাহায্য সংস্থাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চলছে। তবে চীন এ ব্যাপারে সর্বোচ্চ আগ্রহ দেখিয়েছে। ভারতও ঋণের একটা অংশ দিতে চাইছে। গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ হলে অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব পড়বে। দেশের জিডিপি অনেক বেড়ে যাবে। ভারত, বাংলাদেশ, চীন, ভুটান, মিয়ানমারের সঙ্গে আন্তঃযোগাযোগ বৃদ্ধি পাবে। আমদানি-রফতানির ক্ষেত্রে পণ্য পরিবহনে ভারত এ বন্দর ব্যবহার করতে পারবে। অর্থাৎ এই একটি গভীর সমুদ্রবন্দর বাংলাদেশকে সিঙ্গাপুরে উন্নীত করতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস। এ বন্দরের প্রভাবে দেশের অর্থনীতির আমূল পরিবর্তন হবে।
২০০০ : এর ফলে আমদানি-রফতানির ক্ষেত্রে আমরা কীভাবে লাভবান হব?
শাজাহান খান : গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মিত হলে এ বন্দর প্রতিবেশী ও বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রগুলো ব্যবহার করবে। বন্দর যত বেশি ব্যবহৃত হবে আমরা তত বেশি লাভবান হব। এ বন্দর ভারত ও চীনের বেশি ব্যবহার করার সম্ভাবনা রয়েছে। এটি আমাদের অর্থনীতির জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে। এ বন্দর নির্মাণ প্রক্রিয়া শুরু হলে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে। পাশাপাশি গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠবে নানা অবকাঠামোগত খাত, যেখানে অর্ধলক্ষাধিক মানুষের কাজের ক্ষেত্র তৈরি হবে বলে আমরা মনে করি। এক কথায় বলা যায়, গভীর সমুদ্রবন্দরকে সামনে রেখে আমাদের অর্থনীতির পুরো চেহারা বদলে যাবে।
২০০০ : গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ মহাজোটের নির্বাচনী ইশতেহারে ছিল। বন্দর নির্মাণ প্রক্রিয়া কি ইশতেহারের কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকবে, না সত্যি সত্যি বাস্তবে রূপান্তরিত হবে?
শাজাহান খান : বর্তমান সরকার কথা নয় কাজে বিশ্বাসী। আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারে যেসব প্রতিশ্রুতির উল্লেখ আছে তার সব পূরণ করা হবে। এক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের সময়েই গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের কাজ শুরু হবে। এ বন্দর নির্মাণে দেশি-বিদেশি অনেক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় জড়িত। দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে আমরা কোনো কাজ করব না। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ও পদ্মা সেতুর নির্মাণের কাজ এ সরকারের সময়ে সম্পন্ন হবে আমরা বিশ্বাস করি।
২০০০ : মোট কয় স্তরে সম্পন্ন হবে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের কাজ?
শাজাহান খান : গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ একটি দীর্ঘমেয়াদি কর্মপ্রক্রিয়া। এটা রাতারাতি করা সম্ভব নয়। এ কাজ করতে আমরা বেশ কয়েকটি স্তরে ভাগ করে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা নিয়েছি। সব প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। স্বল্পতম সময়ের মধ্যে বন্দর নির্মাণের কাজ শুরু করা হবে।
২০০০ : অভিযোগ উঠেছে, পদ্মা সেতু নির্মাণ নিয়ে দীর্ঘসূত্রতার একটা সমস্যা চলছে। গভীর সমুদ্রবন্দর নিয়েও কি সে ধরনের কোনো সমস্যা আছে?
শাজাহান খান : দেখেন পদ্মা সেতু নিয়ে কোনো ধরনের দীর্ঘসূত্রতা চলছে বলে মনে করি না। পদ্মা সেতুর প্রস্তাবিত ব্যয়সীমা বেড়ে যাওয়ায় সরকারকে একটু সময় নিতে হচ্ছে। অচিরেই কাজ শুরু হবে। আর গভীর সমুদ্রবন্দর নিয়ে সে ধরনের কোনো সমস্যার সম্ভাবনা নেই। আমরা রাজনীতি করি। জনগণের প্রতি আমাদের কমিটমেন্ট রয়েছে। এই কমিটমেন্ট পূরণ করতে না পারলে এর ফল কী হতে পারে তা আমাদের জানা আছে।
২০০০ : গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে অতীতে অনেক সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু তা পালন করেনি এ রকম প্রমাণ আছে। এ ব্যাপারে আপনি কী বলেন?
শাজাহান খান : অতীতে যারা জনসাধারণের কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভঙ্গ করেছে মহাজোট সে পথে হাঁটবে না। আমরা গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে তিন পর্বের প্রথম পর্যায়ের কাজ আমাদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করে যাব।
সাক্ষাৎকার গ্রহণ : খন্দকার তাজউদ্দিন

সোনাদিয়া সাব-রিজিওনাল হাব হতে পারে
ড. মাসুদুর রহমান

রিসার্চ ফেলো, সিপিডি

সাপ্তাহিক ২০০০ : গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মিত হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তা কী রকমের প্রভাব ফেলবে?
মাসুদুর রহমান : গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মিত হলে দেশের অর্থনীতিতে অবশ্যই ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে; যা কিনা আমাদের অর্থনীতির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যেহেতু বঙ্গোপসাগরে কোনো গভীর সমুদ্রবন্দর নেই, এবং বাংলাদেশ যদি এই গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে দেরি করে তবে ভারত, মিয়ানমার গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণকাজ শুরু করে দেবে, তাহলে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক উন্নয়নে একটা সুযোগ হাতছাড়া করব, যা কিনা কোনোদিনও অর্জন করা সম্ভব হবে না। গভীর সমুদ্রবন্দর হলে দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে এবং তা জিডিপিতে এর বহুমুখী প্রভাব পড়বে। অনেক ব্যবসায়ী মনে করেন, বাংলাদেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে লিড টাইম ৭ দিনে কমে আসবে, যদি গভীর সমুদ্রবন্দর হয়, কেননা বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে মাদার ভেসেল প্রবেশ করতে পারে না। বর্তমানে আমাদের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের পরিমাণ ৩০ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২০ সাল নাগাদ বৃদ্ধি পাবে। বর্তমান চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে এটা কোনোভাবেই দতার সঙ্গে পরিচালনা করা সম্ভব হবে না। বর্তমান বিশ্বের দুই পরাশক্তি ভারত ও চীন আমাদের পাশাপাশি অবস্থান করায় আমাদের জন্য ইতিবাচক হয়েছে। ভারতে ও চীনের বৈদেশিক বাণিজ্য যে হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, অদূরভবিষ্যতে আরো বৃদ্ধি পাবে। বিশেষ করে ভারত ও চীনের খধহফষড়পশ প্রদেশগুলোর (উত্তর-পূর্ব অঞ্চল এবং চীনের দণি অঞ্চল) অন্যতম মাধ্যম হবে এই সমুদ্রবন্দর, যা থেকে আমরা যেমন লাভবান হব, তেমনি চীন ও ভারত সমানভাবে উপকৃত হবে, যা অর্থনীতিতে বহুমুখী ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। অর্থাৎ সোনাদিয়ায় নির্মিত গভীর সমুদ্রবন্দর এ অঞ্চলের জন্য ‘সাব-রিজিওনাল বাণিজ্যিক হাব’ হিসাবে পরিগণিত হবে।
২০০০ : কেউ কেউ এই সমুদ্রবন্দর নির্মাণ নিয়ে নেতিবাচক কথা বলছেনÑ তারা বোঝাতে চাইছেন এই বন্দর আসলে আন্তঃরাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার কাঠামোকে দুর্বল করে দেবে। আপনি কী এ রকম বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেন?
মাসুদুর রহমান : যারা বোঝাতে চাইছেন, গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মিত হলে আন্তঃরাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার কাঠামো দুর্বল হবে অথবা বিভিন্ন রকম নেতিবাচক কথা বলছেন তাদের সঙ্গে আমি একমত পোষণ করি না। কারণ আমি মনে করি, যারা এই কথা বলছেন তারা শুধু নেতিবাচক কথা বলতে হবে সে জন্যই এ ধরনের কথা বলছেন। বর্তমান বিশ্বে এ ধরনের খোঁড়া যুক্তি আর চলে না। যারা এ ধরনের মনগড়া যুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করছেন আমি তাদের সঙ্গে সঙ্গত কারণে দ্বিমত পোষণ করছি। বাংলাদেশের নিরাপত্তায় গভীর সমুদ্রবন্দর কোনো ফ্যাক্টর হিসাবে কাজ করবে না। বাংলাদেশকে এগিয়ে নেয়ার জন্য এই সমুদ্রবন্দর অদূর ভবিষ্যতে একটা বড় ভূমিকা রাখবে। যেমনÑ সিঙ্গাপুর, হংকং এমনকি শ্রীলঙ্কা, যাদের অর্থনৈতিক প্রধান চালিকাশক্তি সমুদ্রবন্দর।
২০০০ : রাজনৈতিক কোনো প্রতিবন্ধকতা আছে কি?
মাসুদুর রহমান : রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা কিছুটা হলেও আছে, তবে এই গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ শেষে যেসব সুবিধা এবং অর্থনৈতিক খাত উন্নত হবে তা নিয়ে গণমাধ্যমে আরো বেশি প্রচার দরকার। গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। তাই আমি মনে করি, নিজেদের স্বার্থে দেশের উন্নয়নের কথা ভেবে সব রাজনৈতিক দলের উচিত জনসাধারণের সামনে এই বন্দরের ইতিবাচক প্রভাবের কথা তুলে ধরা।
২০০০ : সমুদ্রবন্দর নির্মাণে অর্থ অনুদান পাওয়া যেতে পারে?
মাসুদুর রহমান : সমুদ্রবন্দর নির্মাণে চীন ও অন্যান্য দাতা সংস্থা অনুদান দেবে। তবে চীন কী পরিমাণ অনুদান দেবে সে বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত প্রস্তাব পাওয়া যায়নি। চীন ইতিমধ্যে ইরান, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কাকে গভীর সমুদ্রবন্দর তৈরিতে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দিয়েছে। তবে আমাদের কৌশলগত কারণে চীনের পাশাপাশি ভারতের সহযোগিতা নিয়ে এই বন্দর নির্মাণ করতে হবে, তাহলে সেটা দেশের জন্য ইতিবাচক হবে।
সাক্ষাৎকার গ্রহণ : আরেফিন তানজিব

বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রবন্দর মুক্ত বন্দর হতে পারে
প্রকৌশলী ম. ইনামুল হক, নদী ও বন্দর বিশেষজ্ঞ

বাংলাদেশ সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করতে চাচ্ছে। আমি বলি এরচেয়ে মহেশখালী চ্যানেল অনেক বেশি বাস্তবসম্মত স্থান। এই দুটি স্থান কাছাকাছি হওয়ায় এই এলাকায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মিত হলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটবে ঠিকই কিন্তু তা দিয়ে আমরা সিঙ্গাপুর বা হংকংয়ের চেয়েও এগিয়ে যাব এটা অবাস্তব আকাশকুসুম কল্পনা। সিঙ্গাপুর পূর্ব এশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের সঙ্গে আফ্রিকা ও ইউরোপের যোগাযোগের পথে অবস্থিত। ফলে এর পশ্চাদ্ভূমিতে পড়ে চীন, কোরিয়া, জাপান, ফিলিপাইনস, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যাান্ড এবং অন্যান্য ছোটখাটো দেশ। তাছাড়া এই বন্দর প্রশান্ত মহাসাগর ও ভারত মহাসাগর সংযোগ নৌপথের মূল স্রোতে পড়ে। হংকং বন্দরের পশ্চাদ্ভূমিতে রয়েছে চীন, যে নিজেই একটি মহাদেশের সমান এবং এই বন্দর পূর্ব ও পশ্চিমের যোগাযোগের মূল স্রোতে পড়ে। বাংলাদেশের গভীর সমুদ্র বন্দর মহেশখালী বা সোনাদিয়াতে হলে ভারতের উত্তর- পূর্বাঞ্চল মূলত এর পশ্চাদ্ভূমি হবে। অনেকে বলেন, মিয়ানমার এবং চীনের ইউনান এর আওতায় আসবে। তারা ওইসব এলাকার ভূপ্রাকৃতিক গঠন কী রকম তা জানেন না। সুদীর্ঘ পথ এবং দুর্গম পাহাড়-পর্বত ডিঙিয়ে চীন কেন অন্য দেশের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের বন্দরে মালামাল পাঠাবে? বন্দরে মালমাল ওই এলাকা থেকেই আসবে, যে এলাকা থেকে সড়কপথে আনা-নেয়া কম ব্যয়সাধ্য হয়।
বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রবন্দর একটি মুক্ত বন্দর হতে পারে, যেখানে কাস্টমস ডিউটির বিশেষ ছাড় এবং অন্যান্য সুযোগ থাকতে পারে। হংকং, সিঙ্গাপুর ফ্রি পোর্ট; কলকাতা, মুম্বাই বন্দরে ফ্রি পোর্ট এলাকা আছে। বাংলাদেশের মুক্ত বন্দর নির্মাণে লগ্নি করতে চীন উৎসাহী, ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্র তাদের স্বার্থে আন্তঃরাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার বিশেষ সুযোগ চাইবে।
অবশ্যই সম্ভব, বাংলাদেশে তো বটেই। এখন চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে অনেক বড় জাহাজ ঢুকতে পারে না বিধায় সেগুলো গভীর সমুদ্রে নোঙ্গর করে থাকে। সেখান থেকে ছোট ছোট জাহাজে মাল কিস্তিতে খালাস করে বন্দরে আনা হয়। এভাবে আমদানি খরচ বেশি পড়ে। গভীর সমুদ্রবন্দর হলে মালামাল সরাসরি খালাস করে ট্রেনে বা ট্রাকে তোলা যাবে। যেহেতু গভীর সমুদ্র বন্দরের একটা বড় পশ্চাদ্ভূমি থাকবে, তাই এর মাধ্যমে আমরা আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্যের বড় সুযোগ পাব। নেদারল্যান্ডসের রটারড্যাম বন্দরে ইউরোপের বিশাল এলাকার মালামাল ওঠানামা করে। আমাদের গভীর সমুদ্রবন্দর অর্থনীতিতে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিই পাল্টে দেবে।
বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ নিয়ে চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র এবং মিয়ানমার সরাসরি হস্তপে করতে চাইবে। এরা বাংলাদেশে তাদের সমর্থকদের দিয়ে রাজনীতির খেলা খেলবে। তবে বাংলাদেশে দেশপ্রেমিক নেতৃত্ব মতায় থাকলে এবং তাদের মধ্যে বিচণতা কাজ করলে এসব বাইরের চাপ ঠিকমতো সামলানো সম্ভব। গভীর সমুদ্রবন্দর যদি সোনাদিয়ায় শুরু হয় তাহলে তা শিগগিরই আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র এবং বড় ধরনের দুর্নীতির শিকার হয়ে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। কারণ সোনাদিয়া গভীর সাগরের কাছাকাছি একটি ছোট দ্বীপ। এখানে গভীর সাগরে ব্রেকওয়াটার এবং দ্বীপের সবটাই কেটে বন্দর এলাকা তৈরি করতে হবে। এভাবে সামান্য কর্মকা-েই দ্বীপটির অস্তিত্ব বিলুপ্ত হবে ও পরিবেশের বিপর্যয় আনবে। তখন এ নিয়ে অনেক কথা উঠবে। তাছাড়া এখানে বন্দরটি বিস্তৃত করার যথেষ্ট স্থান না থাকায় গভীর সমুদ্রবন্দরটি এই স্থানের পরিবর্তে মহেশখালীর দুপারে করা দরকার। মহেশখালী নদীর ভেতরে বড় প্রাকৃতিক পোতাশ্রয় এবং নদীর মোহনায় ব্রেকওয়াটার নির্মাণের জন্য প্রাকৃতিক ভূগঠন পাওয়া যাবে।
গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করতে রটারড্যাম বন্দরকে উদাহরণ হিসাবে নেয়া যায়। মহেশেখালী চ্যানেলের পশ্চিম পারে গোরকঘাটা এবং পূর্ব পারে খুরুশকুল ও ফসিয়াখালী এলাকায় রেল সংযোগ ও জেটি স্থাপন করতে হবে। এরপর কক্সবাজার ও সোনাদিয়া বরাবর প্রাকৃতিকভাবে থাকা ঢেউভাঙা সাগরতল ধরে ব্রেকওয়াটার নির্মাণ করতে হবে। মহেশখালীর এক পারে কার্গো ও বাল্ক এবং অন্য পারে কনটেইনার জাহাজ ভেড়ার সুযোগ রাখা যেতে পারে। সাগর থেকে জেটি পর্যন্ত চলাচলের জন্য বন্দরের গভীরতা নিয়মিত ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে ২০ থেকে ২৪ মিটার রাখতে হবে। ব্রেকওয়াটারের বাইরে সাগর বেশ গভীর থাকায় সেখানে খনন কাজের প্রয়োজন নেই।
সময় আরো বেশি লাগতে পারে। আমি চাহিদা মোতাবেক বন্দরের এলাকা প্রসারের পপাতী। একটি মহাপরিকল্পনা মোতাবেক ধীরে ধীরে বাস্তবসম্মতভাবে কাজ এগোলে সময় বা ব্যয় কোনো ব্যাপার নয়। নির্মাণ কাজে স্বচ্ছতা, অবকাঠামো নির্মাণে জাতীয় স্বার্থ দেখা এবং সুষ্ঠু পরিচালনা হলে সময় বা অর্থব্যয় যৌক্তিক হতে বাধ্য। তখন দ্রব্যসামগ্রীর উচ্চমূল্যের সঙ্গে বন্দরের আয়ও বাড়বে।

জনগণের মতামত অনুযায়ী কাজ করলেই দেশের স্বার্থ বজায় থাকবে
রুহিন হোসেন প্রিন্স, কেন্দ্রীয় সংগঠক
তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি

বাংলাদেশ এমন একটি ভৌগোলিক অবস্থানে রয়েছে যেখানে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর হতেই পারে। এটা নিয়ে সংশয় থাকা উচিত নয়। কিন্তু সেজন্য বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউয়ের কথা ভেবে সে অনুযায়ী কারিগরি দিক, অবকাঠামোগত দিকে কোনো ফাঁকি না দিয়ে যাতে মজবুতভাবে গড়ে তোলা হয় সেদিকটায় প্রাধান্য দিতে হবে।
আর ভূ-রাজনৈতিক ইস্যু একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। এটা চিন্তা করে অবশ্যই সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। বর্তমান বিশ্বের সাম্রাজ্যবাদী শক্তি কেবল এ সময়েই নয়, বলা যায় সব সময়ই সমুদ্র অঞ্চল এবং সমুদ্রবন্দর ঘিরে তৎপর থাকে। আমাদের বন্দর যাতে তাদের চক্রান্তের শিকার না হয় সেদিকটাতে খুবই সতর্ক থাকতে হবে। না হলে গভীর সমুদ্রবন্দর করার সব উদ্দেশ্য নস্যাৎ হয়ে যাবে। দেশের সার্বভৌমত্বও হুমকির মুখে পড়বে।
আরেকটি ব্যাপার হলো এ উপমহাদেশে আমাদের আশপাশেই দু-একটি দেশ রয়েছে যারা আমাদের অধিকার হরণ করে হলেও নিজেদের জন্য অতিরিক্ত সুবিধা নিয়ে যেতে চায়, সেসব দেশ যাতে তাদের দুরভিসন্ধি চরিতার্থ করতে না পারে সেটাও খেয়াল রাখতে হবে। না হলে এখানেও কিন্তু দেশের সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়বে।
এ বন্দর হলে আমরা যদি সেটাকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারি তবে আর্থিকভাবে অবশ্যই লাভবান হব। সেজন্য আমাদের একটা সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা করতে হবে। কেননা সেটিকে ব্যবহার করে আমরা পুরো অঞ্চলে আমাদের প্রভাব বিস্তার করতে পারব। কিন্তু তা বাস্তবায়ন করতে হলে প্রজ্ঞা, দেশপ্রেমে সমৃদ্ধ যে সরকার দরকার তা আমাদের নেই। আমাদের খেয়াল রাখতে হবে বন্দরটিকে ব্যবহার করে যাতে কেউ ব্যক্তিস্বার্থ, গোষ্ঠীস্বার্থ চরিতার্থ না করে। মনে রাখতে হবে কেবল তথাকথিত ব্যবসায়ীদের সুবিধা দেখলে চলবে না, বন্দর জনগণের সম্পদ, জনগণের হিস্যা সঠিকভাবে বুঝিয়ে দিতে হবে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের কোনো সরকার এমনটি করতে পারেনি, পারে না। কাজেই এখানে একটা আশঙ্কা থেকেই যায়, বন্দরটি হলে এর ব্যবহারে প্রকৃতঅর্থে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা কতখানি থাকবে।
বন্দরটি বাস্তবায়িত হবে কিনা তা নিয়েও যেসব কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে তাতে স্পষ্ট করে বলতে পারছি না যে কি হবে। আর বাস্তবায়িত হলে দেশের স্বার্থ কতখানি বজায় থাকবে সেটাও নিশ্চিত করতে হবে। যেসব আশঙ্কার কথা বললাম তার ইতিবাচক সমাধানের জন্য যদি সরকার জনগণের মতামত নেয় এবং জনগণের মতামত অনুযায়ী যদি কাজ করে তবেই মনে হয় দেশের স্বার্থ বজায় থাকবে। দেশের ভালো হবে।

গভীর সমুদ্রবন্দর দেশে দেশে
নীলোৎপল সেন

গভীর সমুদ্রবন্দর বলতে এমন বন্দর বোঝায় যেখানে যে কোনো প্যানাম্যাক্স জাহাজ সম্পূর্ণভাবে নোঙর করতে পারে। অক্টোবর ২০০৬ সালের পানামা খাল পরিবর্ধন প্রস্তাবনা দ্বারা এ বন্দর অনুমোদন লাভ করে। গভীর সমুদ্রবন্দর রয়েছে এমন মহাদেশগুলো হলো আফ্রিকা, আমেরিকা, এশিয়া, ইউরোপ ও ওশেনিয়া।

আফ্রিকার গভীর সমুদ্রবন্দরগুলো হলো : টাংগার-মেড, মরক্কো; জোর্ফ লাসফার, মরক্কো; নৌআধিবু, মৌরিতানিয়া (লৌহ রফতানি বন্দর); নৌয়াকচট, মৌরিতানিয়া (ফসফেট খনির প্রয়োজনে রেললাইন বসানোর জন্য প্রস্তাবিত); পোর্ট কামাসার, গিনি (বক্সাইট রফতানি বন্দর); মাতাকং, গিনি (সিমান্দু এবং কালিয়া লৌহ খনির বন্দর); মনরোভিয়া, লাইবেরিয়া; সেকোন্দি-তাকোরাদি, ঘানা (১৯২৮ সালে নির্মিত); টেমা, ঘানা (১৯৬১ সালে নির্মিত); কোটোনু, বেনিন; লোমে, টোগো; ক্রিবি, ক্যামেরুন (তেল বন্দর); লোবালে, ক্যামেরুন (লৌহ বন্দর), ওবেন্দো, গ্যাবন (রেলসড়ক শুরু); শান্তাকারা, গ্যাবন (রেলসড়ক শুরু এবং মাকোকু লৌহ খনির বন্দর); লোবিতো, অ্যাঙ্গোলা; ওয়ালভিস বে, নামিবিয়া (রেলসড়ক শুরু); সালদানহা বে, দক্ষিণ আফ্রিকা; পোর্ট অব নাকালা, মোজাম্বিক; রিচার্ডস বে, দক্ষিণ আফ্রিকা; নাগকুরা, দক্ষিণ আফ্রিকা (২০০৭ সাল থেকে নির্মাণাধীন)।
আফ্রিকার প্রস্তাবিত গভীর সমুদ্রবন্দরগুলো হলো : বার্গনি, সেনেগাল; স্যানপেদ্রো, কোটে ডি আইভোরি (লৌহ বন্দর); তাগরিন পয়েন্ট, সিয়েরা লিওন (লৌহ বন্দর); আইকট আকপাটেক, আকওয়া-আইবম, নাইজেরিয়া; সিয়ারওয়াটার বে, নামিবিয়া (কয়লা বন্দর লুদারিটজ থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে); লামু এবং কোয়েগা বন্দর।
আটলান্টিক মহাসাগরে অবস্থিত গভীর সমুদ্রবন্দরগুলো হলো : পোর্ট অব বাল্টিমোর; পোর্ট ক্যানাভেরাল; পোর্ট এভারগ্লেডস; স্টেপ আইলেস, পোর্ট কার্টিয়ার (সেন্ট লরেন্স নদীর ওপর লৌহ রফতানি বন্দর); চান্দলার; মেলফোর্ড টার্মিনাল; পোর্ট হ্যালিফ্যাক্স, পোর্ট অব নিউইয়র্ক অ্যান্ড নিউজার্সি।
প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থিত গভীর সমুদ্রবন্দরগুলো : পোর্ট অব প্রিন্স রুপার্ট (এই বন্দর থেকে উত্তর আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে রেল সংযোগ রয়েছে); পোর্ট আলবার্নি; পোর্ট অব ভ্যানকুভের; ক্রফটন; পোর্ট অব বাল্টিমোর; পোর্ট অব বোস্টন; পোর্ট অব উইলমিংটন; পোর্ট অব চার্লসটন; পোর্ট অব স্যাভানাহ; পোর্ট ক্যানাভারেল; পোর্ট এভারগ্লেডস; পোর্ট অব মিয়ামি; পোর্ট অব সিয়াটল; পোর্ট অব ট্যাকোমা; পোর্ট মেডিসন (কখনো এটাকে মেডিসন বে বলা হয়, যা পুগেট সাউন্ডের গভীর সমুদ্রবন্দর); পোর্ট অ্যাঞ্জেলস, পোর্ট অব গ্রেইজ হার্বার; পোর্ট অব লংভিউ; পোর্ট অব কালামা; পোর্ট অব ভ্যানকুভের ইউএসএ; পোর্ট অব পোর্টল্যান্ড; পোর্ট অব কুস বে; পোর্ট অব হামবোল্ট বে (সানফ্রান্সিসকো এবং ক্যালিফোর্নিয়ার একমাত্র গভীর সমুদ্রবন্দর); পোর্ট অব রিচমন্ড; পোর্ট অব স্টকটন; পোর্ট অব ওকল্যান্ড; পোর্ট অব রেডউড সিটি; পোর্ট হুয়েনেমে; পোর্ট অব লস অ্যাঞ্জেলেস; পোর্ট অব লং বিচ; পোর্ট অব স্যান দিয়াগো।
ক্যারিবিয়ান সাগর এবং গালফ অব মেক্সিকোর গভীর সমুদ্রবন্দরগুলো : পোর্ট অব ট্যাম্পা; পোর্ট অব মোবাইল; পোর্ট অব নিউ অর্লিয়ান্স; পোর্ট অব বিউমন্ট (টেক্সাসের বিউমন্টের গভীর সমুদ্রবন্দর); পোর্ট অব গ্যালভেস্টন (পশ্চিম নিউ অর্লিয়ান্সের গালফ কোস্টের সবচেয়ে পুরনো বন্দর); পোর্ট অব হিউস্টোন (টেক্সাসের হিউস্টোনে অবস্থিত বিশ্বের ব্যস্ততম ১০টি বন্দরের একটি); পোর্ট অব পোন্স।
সেন্ট্রাল আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকার গভীর সমুদ্রবন্দরগুলো : বুয়েন্স আয়ার্স (আর্জেন্টিনা); বাহিয়া ব্লাঙ্কা (আর্জেন্টিনা); কিউকিউয়েন (আর্জেন্টিনা); ব্রিজটাউন (বার্বাডোজ); পোর্ট অব টুবারাও ভিটোরিয়া (ব্রাজিল); পোন্টা ডা ম্যাডেইরা (ব্রাজিল); পোন্টা উবু (ব্রাজিল); গুয়াইবা (ব্রাজিল), ইটাগুয়াই (ব্রাজিলের লৌহ রফতানি বন্দর); ভালপারাইসো; কার্টাগেনা (কলোম্বিয়া); সিয়েনাগা, কয়লা রফতানি বন্দর (কলোম্বিয়া); মান্টা (ইকুয়েডর); পুয়েরতো বলিভার (ইকুয়েডর); লাজারো কার্ডিনাস (মেক্সিকো); ম্যানজানিলো, কোলিমা (মেক্সিকো); পুন্টা কোলোনেট (ক্যালিফোর্নিয়ার বাজার নিকটবর্তী); কোলোন (পানামা); মন্টিভিডিও; বোকা গ্র্যান্ডে (ভেনিজুয়েলা)। প্রস্তাবিত পোসোর্জা বন্দর।
ইউরোপ মহাদেশের গভীর সমুদ্রবন্দরগুলো : গিজন (স্পেন); ইতালির গভীর সমুদ্রবন্দরগুলো: গিয়োয়িয়া টাউরো, ক্যাগলিয়ারি। পোর্ট অব জিব্রু¹ি, পোর্ট অব অ্যান্টওয়ার্প, ওমিসালজ (ক্রোয়েশিয়া), ইজমুইডেন (আমস্টারডাম), পোর্ট অব রটারডাম, গিড্যানস্ক (পোল্যান্ড), পোর্ট অব সিনেস (পর্তুগাল); গোথেনবার্গ (সুইডেন), পোর্ট অব সোদারতালজে (স্টকহোম), পোর্ট অব নরকোপিং (ইস্ট কোস্ট, সুইডেন), নারভিক (ডেনমার্ক), পোর্ট অব আরহুস (গ্রিনল্যান্ড), থুলে এয়ার বেস (বিশ্বের একেবারে উত্তরে অবস্থিত সর্বশেষ গভীর সমুদ্রবন্দর), পোর্ট অব হেলসিঙ্কি। ফ্রান্সের গভীর সমুদ্রবন্দর হলো লে হাভরে এবং ফ্যাগিকন ফ্রান্স ডানক্রিক। রিয়োরফজোরো (আইসল্যান্ড)।
যুক্তরাজ্যের গভীর সমুদ্রবন্দরগুলো : পোর্ট অব ব্যারো, পোর্ট অব ফেলিক্সস্টোয়ে, পোর্ট অব লিভারপুল, পোর্ট অব সাউদাম্পটন, পোর্ট ট্যালবট, মিলফোর্ড হ্যাভেন, রেডকার, ইনভারগর্ডন, হান্টারস্টোন টার্মিনাল, হাউন্ড পয়েন্ট।
অস্ট্রেলিয়ার গভীর সমুদ্রবন্দরগুলো : পোর্ট অব টাউনসভিল (সেনা বন্দর), অ্যাবট পয়েন্ট (কয়লা রফতানি টার্মিনাল), ড্যালরিম্পল বে (কয়লা রফতানি টার্মিনাল), হে পয়েন্ট (কয়লা রফতানি টার্মিনাল), গ্ল্যাডস্টোন (কয়লা রফতানি টার্মিনাল), পোর্ট অব ব্রিসবেন (কয়লা ও কনটেইনার বন্দর), পোর্ট স্টিফেনস, নিউক্যাসল (কয়লা, গম), পোর্ট বোটানি (সিডনিতে কনটেইনার বন্দর), পোর্ট কেম্বলা (কয়লা, গম, কার), মেলবোর্ন, গিলং, পোর্টল্যান্ড (ভিক্টোরিয়া), এডেলেইড বহির্বন্দর, পোর্ট বনিথন (কেপসাইজ), হুইয়াল্লা (দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া), শিপ হিল, পোর্ট লিংকন, ফ্রেম্যান্টল, গেরাল্ডটন, ওকজি বন্দর, পোর্ট হেডল্যান্ড, কেপ ল্যাম্বার্ড, ড্যাম্পিয়ের, ইস্ট আর্ম হোর্ফ।
নিউজিল্যান্ডের গভীর সমুদ্রবন্দরগুলো : পোর্ট অব অকল্যান্ড, লিটেলটন, মার্সডেন পয়েন্ট, নিউ প্লাইমাউথ, পোর্ট ক্যালমার্স, টাওরাঙ্গা।
এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের গভীর সমুদ্রবন্দরগুলো : মুয়ারা (ব্রুনেই-এর একমাত্র গভীর সমুদ্রবন্দর)। মালয়েশিয়ার গভীর সমুদ্র বন্দর হলো পোর্ট অব তানজুং পেলেপাস এবং জহর পোর্ট। জাপানের গভীর সমুদ্র বন্দর হলো কাশিমা এবং ফুকুইয়ামা। হংকংয়ে হংকং পোর্ট। সিঙ্গাপুরে পোর্ট অব সিঙ্গাপুর। শ্রীলংকাতে কলম্বো সি পোর্ট। পাকিস্তানে রয়েছে গাদার, করাচি, বিন কাশিম বন্দর। চীনে সাংহাই, কিংদাও, কাওশিউং। ভারতে চেন্নাই পোর্ট ট্রাস্ট, কোচিন পোর্ট ট্রাস্ট, ভাল্লারপাদাম কনটেইনার টার্মিনাল, ধারমা পোর্ট, ইন্নোরে পোর্ট লিমিটেড, হাজিরা পোর্ট প্রাইভেট লিমিটেড, জওয়াহেরলাল নেহরু পোর্ট ট্রাস্ট (মুম্বাই); কাকিনাড়া সি পোর্ট লিমিটেড, মুন্দ্রা পোর্ট, কান্দলা পোর্ট ট্রাস্ট, মরমুগাঁও পোর্ট, নিউ ম্যাঙ্গালোর পোর্ট, পোর্ট অব প্যারাদিপ, পোর্ট পিপাভাব, টুটিকোরিন পোর্ট ট্রাস্ট, ভিসাকাপত্তম পোর্ট ট্রাস্ট। সৌদি আরবের গভীর সমুদ্রবন্দর হলো দাম্মাম এবং জেদ্দা সি পোর্ট। আরব আমিরাতে দুবাই সি পোর্ট। এ অঞ্চলে প্রস্তাবিত গভীর সমুদ্রবন্দরগুলো হলো সোনাদিয়া (বাংলাদেশ, কক্সবাজারের সন্নিকটে), ইয়াংশান (কোরিয়া), কিয়াউকফিউ (মিয়ানমার, চীনে তেল রফতানির জন্য), থ্যানলাইয়িন (বার্মা), ভ্যান ফং পোর্ট।
গভীর সমুদ্রবন্দর কোন কোন দেশে রয়েছে, সেসব দেশের বর্তমান অবস্থা কী তা পর্যালোচনা করলে দেখা যায় বর্তমান বিশ্বের বেশিরভাগ উন্নত দেশেই রয়েছে গভীর সমুদ্রবন্দর এবং ওপরের তালিকাটি তার প্রমাণ। এসব দেশের বার্ষিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির তালিকা দীর্ঘ না করেও বলা যায়, সেসব দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কেমন। বলাই বাহুল্য, গভীর সমুদ্রবন্দরসমৃদ্ধ দেশগুলো আমদানি-রফতানি সুবিধার পাশাপাশি গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে পর্যটন, হোটেল বাণিজ্যের মাধ্যমেও অর্জন করছে বাড়তি অর্থনৈতিক সুবিধা।

Tuesday, January 4, 2011

প্রজাপতির ডানায় যখন জিপিএস

প্রজাপতির ডানায় যখন জিপিএস

মোঃ হাবিবুর রহমান, ১৪ ডিসেম্বর ২০০৯,

স্যাটেলাইটনির্ভর জিপিএস বা গ্লোবাল পজিসনিং সিস্টেম ব্যবহার করে আজকাল ড্রাইভিং থেকে শুরু করে সমুদ্র নেভিগেশন, আবহাওয়ার অবস্থা, প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাস প্রভৃতি আধুনিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে নিখুঁতভাবে। পৃথিবীর কক্ষপথে স্থাপিত কৃত্রিম উপগ্রহের মাধ্যমে এটি সম্ভব হয়েছে। প্রকৃতিতেও এই ধরনের জিপিএস সিস্টেম ব্যবহারের উদাহরণ রয়েছে। উত্তর আমেরিকার মনার্ক প্রজাপতি প্রকৃতির এক বিস্ময়।
নির্দিষ্ট হেমন্ত মৌসুমে প্রায় ১০ লাখ প্রজাপতি দল বেঁধে দক্ষিণাঞ্চলে পাড়ি জমায়। দীর্ঘ চার হাজার কিলোমিটার পথ নিখুঁতভাবে পাড়ি দিয়ে ওরা পৌঁছে মেক্সিকোতে। সাধারণ এক পতঙ্গের এই দীর্ঘ পথপরিক্রমার রহস্য ভেদ হয়নি এতদিন। বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, প্রজাপতি মস্তিষ্কের জৈব ঘড়ির সাহায্যে সূর্যের অবস্থান নির্ণয় করে তাদের নির্দিষ্ট পথ চিনে নেয়। কিন্তু সম্প্রতি মার্কিন বিজ্ঞানীদের এক গবেষণায় মনার্ক প্রজাপতির পথ চলার রহস্য উদঘাটিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস মেডিকেল স্কুল বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক পরীক্ষা করে দেখেছেন, প্রতি বছর হেমন্তে মনার্ক প্রজাপতিরা তাদের শুঁড়ে অবস্থিত ঘড়ি আর সূর্যের অবস্থান মিলিয়ে অসাধারণ এক জিপিএস সিস্টেমে তাদের দীর্ঘ পথ চিনে নেয়।
Source: Daily Amardesh

টিএসসিতে রঙিন ডানার ওড়াউড়ি

টিএসসিতে রঙিন ডানার ওড়াউড়ি

স্টাফ রিপোর্টার, ২৩ এপ্রিল ২০১০
প্রজাপতি মানেই লাল, নীল, সবুজ, হলুদ, সোনালি, বেগুনি ইত্যাদি বহুবর্ণের ছটা— যার সৌন্দর্য শিল্পীর সৃষ্টিকেও হার মানায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বরে এখন চলছে নানা বর্ণের প্রজাপ্রতির ওড়াউড়ি। চত্বরে গেস্টরুমের সামনে নেট দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন অসংখ্য জীবন্ত প্রজাপতি। আর রুমের মধ্যে রয়েছে ৭ গোত্রের ১৮০ প্রজাতির প্রজাপতির আলোকচিত্র। দুয়ে মিলে প্রজাপ্রতির রঙে রঙিন হয়ে উঠেছে টিএসসি চত্বর। এসব প্রজাপতির সৌন্দর্য দর্শনার্থীদের মধ্যে সৃষ্টি করছে দুর্নিবার কৌতূহল আর নির্মল আনন্দ। ইবিবিএল এবং পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন যৌথ উদ্যোগে এ প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে। আমাদের দেশে এ ধরনের আয়োজন এটাই প্রথম। গতকাল বিকালে পরিবেশমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ প্রধান অতিথি হিসেবে এ প্রদর্শনীর শুভ উদ্বোধন করেন। এ সময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ড. আআমস আরেফিন সিদ্দিক, প্রোভিসি অধ্যাপক হারুন অর রশীদ প্রমুখ। তিন দিনব্যাপী এ প্রদর্শনী চলবে ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ডা. এম এ বাশারের তত্ত্বাবধানে প্রায় ২০ জন গবেষক ১৯৯৯ সাল থেকে দীর্ঘ ১১ বছর নিরলস পরিশ্রম করে দেশের প্রত্যন্ত বনাঞ্চল থেকে সংগ্রহ করেছেন বিভিন্ন প্রজাতির প্রজাপতির অসংখ্য আলোকচিত্র। তাদের সংগৃহীত সেসব আলোকচিত্র স্থান পেয়েছে প্রদর্শনীতে। প্রদর্শনীতে রয়েছে বার্ড উইং, নিমফালিড, লাইসানিড, প্যাপিলিওনিড, সেটাইরিড, হেসাপিরিড ইত্যাদি প্রজাতির প্রজাপতি। এর মধ্যে বার্ড উইয়ং বিশ্বের বৃহত্তম প্রজাতির প্রজাপতি, যার অস্তিত আমাদের দেশেও রয়েছে।
আমাদের দেশে রয়েছে প্রায় দুইশ’ প্রজাতির প্রজাপতি । প্রকৃতির দৃষ্টিনন্দন প্রাণী এই প্রজাপতি সৌন্দর্য এবং বর্ণিল রঙের বাহারে মানুষকে মুগ্ধ করে। এছাড়াও পরিবেশের জীববৈচিত্র্য অক্ষুণ্ন রাখা ও প্রাকৃতিক জৈব সম্পদ সংরক্ষণে এই প্রজাপতির গুরুত্ব অপরিসীম। অথচ শুধু কাব্য ছাড়া এই সুন্দর প্রাণীটির অস্তিত্ব আজ হুমকির মুখে। প্রজাপতির জন্য অনুকূল পরিবেশ থাকা সত্ত্বেও আমাদের দেশে ভীষণভাবে কমে আসছে এর সংখ্যা— সংকুচিত হচ্ছে বিচরণ ক্ষেত্র। পৃথিবীর অনেক দেশেই বর্তমান সময়ে প্রজাপতির পার্ক গড়ে তোলা হয়েছে। সেসব পার্কে প্রজাপতির জীবনযাত্রার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে জীবন্ত অবস্থায় সংরক্ষণ করা হচ্ছে অসংখ্য প্রজাতির প্রজাপতি; যা দেখতে প্রতিনিয়ত ভিড় জমায় দেশ-বিদেশের হাজার হাজার দর্শনার্থী।
ভবা পাগলার সঙ্গীত সম্মেলন : গানই মোর সর্বশ্রেষ্ঠ সাধন- নিজের জীবনের অর্থ বলতে গিয়ে নিজের লেখা গানের মতো করেই বলেছিলেন বিশিষ্ট সাধক, কবি ও সঙ্গীত সাধক ভবা পাগলা।
সেই মহান সাধকের স্মৃতি স্মরণ করতেই বাংলাদেশ ভবা পাগলা স্মৃতি সংসদ আয়োজন করে ভবা পাগলা সঙ্গীত সম্মেলন। গতকাল বিকালে বাংলাদেশ শিশু একাডেমির মূল মিলনায়তনে এ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী এনামুল হক মোস্তফা শহীদ। বাংলাদেশ ভবা পাগলা স্মৃতি সংসদের সভাপতি আজহারুল ইসলামের সভাপতিত্বে এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন ভবা পাগলার জন্মস্থান মানিকগঞ্জের সংসদ সদস্য এসএম আবদুল মান্নান, ভবা পাগলার ভক্ত ও গবেষক আচার্য গোপাল ক্ষিত্রি, কাংসধর তরফদার প্রমুখ। অনুষ্ঠানে ভবা পাগলার জীবনাদর্শ নিয়ে আলোচনা করেন তার ভক্ত ও গবেষকরা। আলোচনায় প্রধান আলোচক হিসেবে ছিলেন বিশিষ্ট সঙ্গীত ব্যক্তিত্ব মুস্তাফা জামান আব্বাসী। আলোচকরা বলেন, ভবা সারাজীবন গান নিয়েই বেঁচে ছিলেন। তিনি তার কথাও গানে গানে বলতেন।
আলোচনা শেষে ভবা পাগলার লেখা ও সুরারোপিত সঙ্গীত পরিবেশন করেন শিল্পী রথীন্দ্রনাথ রায়, বিপুল ভট্টাচার্য, পান্না বিশ্বাস, বাবুল সূত্রধর, বিমান বিশ্বাস, হালিমা পারভীন প্রমুখ।
Source: Daily Amardesh

প্রজাপতির অভয়ারণ্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

প্রজাপতির অভয়ারণ্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

স্টাফ রিপোর্টার, ১৮ অক্টোবর ২০১০
গাছপালায় ঘেরা দেশের অন্যতম বিশ্ববিদ্যালয় জাহাঙ্গীরনগর ভার্সিটিতে আগামী মাসের শেষদিকে ‘প্রজাপতি মেলা’ আয়োজন করা হবে। পরাগায়ন-সহায়ক এ দৃষ্টিনন্দন প্রজাতির বংশবৃদ্ধির লক্ষ্যে ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ‘প্রজাপতি ঘর’ তৈরির মাধ্যমে পতঙ্গটির বংশবৃদ্ধির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
জানা গেছে, বনভূমির পরিমাণ কমে যাওয়ায় প্রকৃতির অলঙ্কার হিসেবে পরিচিত প্রজাপতির সংখ্যা দিন দিন কমছে। পরাগায়নে যাতে সমস্যা না হয়, সেই লক্ষ্যে সাভারের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের ছাদে ও এর সামনের বাগানে পরিকল্পিভাবে তৈরি করা হয়েছে ‘প্রজাপতি ঘর’। এখানে কৃত্রিম প্রজনন ঘটিয়ে অবমুক্ত করা হচ্ছে প্রজাপতি। তাই সবুজ নিসর্গে ভরা এ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাগানগুলোতে দৃষ্টিনন্দন প্রজাপতির দুরন্ত ওড়াউড়ি চোখে পড়ে।
প্রাণিবিদ্যা বিভাগেরই সহযোগী অধ্যাপক মো. মনোয়ার হোসেন ১৪ বছর ধরে নিরলসভাবে প্রজাপতি নিয়ে গবেষণা করছেন। ১৯৯৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ইসমাইল হোসেনের সঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রথম এ গবেষণার কাজ শুরু হয় বলে জানান তিনি। প্রজাপতির একটি খামার গড়ে তোলারও পরিকল্পনা রয়েছে তার।
অধ্যাপক মনোয়ার বলেন, বিভাগের কীটতত্ত্ব শাখার অধীনে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে প্লেইন টাইগার প্রজাতির প্রায় তিনশ’ প্রজাপতি সম্প্রতি ক্যাম্পাসে অবমুক্ত করা হয়েছে।
তিনি এক তথ্যে জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ইসমাইল হোসেন ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক শফিক হায়দার চৌধুরীর সঙ্গে যৌথভাবে ও তার একক গবেষণায় এ পর্যন্ত প্রজাপতির মোট ১০২টি প্রজাতি শনাক্ত হয়েছে।
অধ্যাপক মনোয়ার হোসেন বলেন, এ পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রজাপতির প্রায় ২০০টি প্রজাতি শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো প্লেইন টাইগার, কমন ক্রো, প্লাম জুডি, ডিঙ্গি বুশব্রাউন, কমন ডাফার, এপফ্লাই, পি ব্লু, টাইনি গ্রাস ব্লু, ওক ব্লু, কমন সেইলর, কমন রোজ, ব্লু মরমন, স্ট্রাইপড অ্যালবাট্রস, মটিলড ইমিগ্রান্ট, কমন গ্রাস ইয়েলো, স্ট্রাইপড পাইরট, মানকি পাজল, ব্লু প্যানসি ও পেইন্টেড লেডি।
তিনি জানান, এসবের মধ্যে স্ট্রাইপড পাইরট, মানকি পাজল, ব্লু প্যানসি ও পেইন্টেড লেডি নামের চারটি প্রজাতি অতিসম্প্রতি শনাক্ত করা হয়েছে।
তবে জাবি ক্যাম্পাসে প্রজাপতির নতুন নতুন প্রজাতির সন্ধান মিললেও দেশে প্রজাপতির সংখ্যা দিন দিন কমছে। বনভূমি কমে যাওয়ায় প্রকৃতির অপরূপ অলঙ্কার এই প্রজাপতিকুলের অস্তিত্বও এখন হুমকির মুখে।
বংশবৃদ্ধির লক্ষ্যে আগামী দিনগুলোতে প্রজাপতির একটি খামার গড়ে তোলার আশাবাদ জানিয়ে এই গবেষক বলেন, প্রজাপতির প্রধান কাজ পরাগায়নে সহায়তা করা। এর মাধ্যমেই উদ্ভিদ বংশবিস্তারে সক্ষম হয়।
প্রজাপতি সংরক্ষণে এখনই উদ্যোগ নেয়ার দাবি জানিয়ে অধ্যাপক মনোয়ার হোসেন বলেন, বাংলাদেশে প্রজাপতির সবক’টি প্রজাতির তালিকা তৈরির পাশাপাশি এদের সংরক্ষণে সরকারি-বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর এগিয়ে আসা উচিত।
প্রজাপতির নান্দনিক ও বাণিজ্যিক ভূমিকা উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রজাপতি আমদানি ও রফতানি করে প্রতি বছর কয়েক মিলিয়ন ডলারের ব্যবসা সম্ভব। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, ইংল্যান্ড প্রজাপতি রফতানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিজ্ঞানীরা গবেষণার পর জানিয়েছেন, সোলার প্ল্যান্টে প্রজাপতির পাখার স্কেল ব্যবহার করে দশ গুণ বেশি সৌরবিদ্যুত্ উত্পাদন করা সম্ভব। বাংলাদেশও এ প্রযুক্তি কাজে লাগাতে পারে বলে জানান তিনি।
পরিবেশ ও প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় প্রজাপতির ভূমিকা তুলে ধরে গণসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে আগামী নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ‘প্রজাপতি মেলা’ করা হবে বলেও জানান অধ্যাপক মনোয়ার হোসেন।
প্রজাপতি প্রতিপালন ও এর নিরাপদ বংশবৃদ্ধির জন্য প্রাণিবিদ্যা বিভাগের দুটি ‘প্রজাপতি ঘর’ তৈরির কথা জানিয়ে তিনি বলেন, এখানে কৃত্রিম উপায়ে প্রজাপতির খাবারসহ (পর্যাপ্ত ফুল ও গাছ) অনুকূল পরিবেশের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তিনি জানান, এখানে প্রজাপতির কৃত্রিম উপায়ে বংশবৃদ্ধি ঘটিয়ে পূর্ণাঙ্গতা প্রাপ্তির পর উন্মুক্ত পরিবেশে ছেড়ে দেয়া হয়। এতে প্রজাপতিকুল রক্ষায় সামান্য হলেও অবদান রাখা হচ্ছে।
Source: Daily Amardesh

প্রেসক্লাবে রঙিন প্রজাপতির ওড়াউড়ি

প্রেসক্লাবে রঙিন প্রজাপতির ওড়াউড়ি

জিয়াউদ্দিন সাইমুম, ২২ নভেম্বর ২০১০
নিত্যদিনের নাগরিক কোলাহলের ভিড়ে হঠাত্ রঙিন ডানার প্রজাপতির দুরন্ত ওড়াউড়ি দেখলে সবার মন জুড়ায়। আর হেমন্তের এই মিঠে-কড়া দিনে রাজধানীর ব্যস্ততম তোপখানা রোডে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সবুজ চত্বরে এখন প্রকৃতির এই অনবদ্য সৃষ্টির যেন বাহারি মেলা বসেছে। সাংবাদিকদের ‘সেকেন্ড হোম’ নামে পরিচিত এই ক্লাবের বাগানের ফুলে ফুলে নানা রংয়ের প্রজাপতির ভিড় এটাই মনে করিয়ে দিচ্ছে, শীতের শুরুতে দিবাচর এই প্রাণীটির প্রজননের সময় এসে গেছে। প্রকৃতির অলঙ্কার এই ক্ষুদে পতঙ্গটির রঙিন ডানা মানুষকে যুগে যুগে কাছে টেনেছে। এটির বাহারি উড়ে চলা দেখে কবি চার্লস ডিকেন্স বড় আফসোস করে বলেছিলেন, ‘আমি স্বাধীন হতে চাই। আর প্রজাপতি জন্ম থেকেই স্বাধীন।’ অথচ খুব বেশি দিন বাঁচে না এ পতঙ্গ। প্রজাতিভেদে এর আয়ু পাঁচদিন থেকে ১০ মাস। দুটি অ্যান্টেনা, দুটি জটিল চোখ আর একটি নলাকার মুখ নিয়েই এদের অনিশ্চিত পথচলা।
বাংলাপিডিয়া মতে, আমাদের দেশে ১২৪ প্রজাতির প্রজাপতি শনাক্ত হয়েছে। এরা ঘণ্টায় ১২ মাইল থেকে ২৫ মাইল বেগে উড়তে পারে। বেশি শীতে এরা টিকতে পারে না বলে অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশে প্রজাপতি নেই। কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ মনে করেন, প্রজাপতি ঘুমায় না। বিশ্রাম নেয় মাত্র। এরা কিছু পাখির মতো পরিযায়ীও বটে।
তবে জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটির প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মনোয়ার হোসেন দাবি করেছেন, এ পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রজাপতির প্রায় ২০০টি প্রজাতি শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— প্লেইন টাইগার, কমন ক্রো, প্লাম জুডি, ডিঙ্গি বুশব্রাউন, কমন ডাফার, এপফ্লাই, পি ব্লু, টাইনি গ্রাস ব্লু, ওক ব্লু, কমন সেইলর, কমন রোজ, ব্লু মরমন, স্ট্রাইপড অ্যালব্যাট্রস, মটিলড ইমিগ্রান্ট, কমন গ্রাস ইয়েলো, স্ট্রাইপড পাইরট, মাংকি পাজল, ব্লু প্যানসি ও পেইন্টেড লেডি।
তিনি জানান, এসবের মধ্যে স্ট্রাইপড পাইরট, মাংকি পাজল, ব্লু প্যানসি ও পেইন্টেড লেডি নামের চারটি প্রজাতি অতি সম্প্রতি শনাক্ত করা হয়েছে।
দিবাচর এ পতঙ্গটি সাধারণত মধু খেয়ে বাঁচে। তবে খাদ্য তালিকায় রয়েছে ফুলের রেণু, গাছের রস, পচা ফল, গোবর, পচনশীল মাংস, বালু অথবা ময়লায় দ্রবীভূত অবস্থায় থাকা খনিজ পদার্থ। পরিবেশ রক্ষায় এ পতঙ্গটির অবদান রয়েছে। এরা ফুলের পরাগায়ণে ভূমিকা রাখে। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে প্রজাপতির আলোক সংবেদী রঙিন পাখা নিয়েই প্রকৃতিপ্রেমীরা মেতে থাকেন।
সম্ভবত এ কারণে বলা হয়ে থাকে প্রজাপতি মানেই লাল, নীল, সবুজ, হলুদ, সোনালি, বেগুনিসহ বহু বর্ণের নয়নাভিরাম ছটা— যার সৌন্দর্য শিল্পীর সৃষ্টিকেও নাকি হার মানায়। আর জাতীয় প্রেস ক্লাব চত্বরে মানবিক এ অনুভূতিটি এখন নতুন গতি পাচ্ছে।
এটা ঠিক যে, প্রকৃতির দৃষ্টিনন্দন প্রাণী প্রজাপতির সৌন্দর্য আর পাখার বর্ণিল রংয়ের বাহার মানুষকে মুগ্ধ করা ছাড়াও পরিবেশের জীববৈচিত্র্যে ভারসাম্য রাখতে সহায়তা দেয়। আবার প্রাকৃতিক জৈবসম্পদ সংরক্ষণেও এটির গুরুত্ব রয়েছে। অথচ এই সুন্দর প্রাণীটির অস্তিত্ব আজ হুমকির মুখে। অনুকূল পরিবেশ থাকা সত্ত্বেও আমাদের দেশে আশঙ্কাজনক হারে কমে আসছে এর সংখ্যা, বনভূমির পরিমাণ কমে যাওয়ায় সংকুচিত হচ্ছে এর বিচরণ ক্ষেত্র।
পৃথিবীর অনেক দেশেই বর্তমানে প্রজাপতি পার্ক গড়ে তোলা হয়েছে। সেসব পার্কে প্রজাপতির জীবনযাত্রার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে জীবন্ত অবস্থায় সংরক্ষণ করা হচ্ছে অসংখ্য প্রজাতির প্রজাপতি। জাতীয় প্রেস ক্লাব এ জাতীয় কোনো প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ না নিলেও নাগরিক যন্ত্রণার ভিড়ে ক্লাবটির সবুজ চত্বরে প্রজাপতির দুরন্ত ওড়াউড়ি কলমজীবীদের মনে ক্ষণিকের জন্য হলেও প্রশান্তি এনে দিচ্ছে। নানা কারণে প্রেস ক্লাবে আসা দর্শনার্থীরাও প্রজাপতির বাহারি পাখা থেকে চোখ ফেরাতে পারছেন না।
প্রজাপতির সৌন্দর্যে মুগ্ধ পুরো বিশ্ব। পূর্ব এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশ এখন রীতিমতো প্রজাপতি রফতানি করছে। তবে জাতীয় প্রেস ক্লাবে রঙিন পাখার নজরকাড়া ওড়াউড়ি এটাই মনে করিয়ে দিচ্ছে, প্রজাপতি নিয়ে ভাবার সময় এসে গেছে।
Source: Daily Amardesh

প্রজাপতির ডানা থেকে বিদ্যুত্

প্রজাপতির ডানা থেকে বিদ্যুত্

জিয়াউদ্দিন সাইমুম, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১০
স্বপ্নে প্রজাপতির প্রসঙ্গ টেনে চীনের মাওবাদী দার্শনিক চুয়াং জু বিশ্বে এক জটিল প্যারাডক্সের জন্ম দিয়ে গেছেন। স্বপ্নে তিনি একটি প্রজাপতি দেখেন, যার মাঝে নেই ব্যক্তি চুয়াং জু’র অস্তিত্বের অনুভূতি। তিনি জেগেই প্রশ্ন করলেন, ‘আমি কি সেই চুয়াং জু, যিনি প্রজাপতি হবার স্বপ্ন দেখার আগে চুয়াং জু ছিলাম নাকি এখন আমি সেই প্রজাপতি, যে প্রজাপতি চুয়াং জু হবার স্বপ্ন দেখছে?’
সেই প্রজাপতি এখন চীনা বিজ্ঞানীদের কাছে গবেষণার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়ে। কারণ, পতঙ্গটির ডানার নিচে সোলার কালেক্টরের অস্তিত্ব বিজ্ঞানীরা আগেই পেয়েছেন। আর সম্প্রতি চীনা বিজ্ঞানীরা প্রজাপতির পাখার বর্ণিল আলোকচ্ছটা আর ফিনফিনে ডানার গাঠনিক কাঠামো গবেষণার পর বলছেন, আগামী দিনগুলোতে প্রজাপতির ডানার এ অনন্য যান্ত্রিক কৌশল অতি সস্তা ও অধিকতর কার্যকর সোলার সেল উদ্ভাবনে সহায়তা দেবে।
ফটোভল্টিয়াক ইফেক্টকে কাজে লাগিয়ে সোলার সেলের মাধ্যমে বিদ্যুত্ উত্পাদন বিশ্বে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। প্রজাপতির ডানার তাপমাত্রা, গাঠনিক কৌশল, লাইট কালেক্টর নিয়ে গবেষণার পর চীনা বিজ্ঞানীরা প্রমাণ পেয়েছেন, টিটানিয়াম ডাইঅক্সাইড ছড়ানো আলোক সংবেদী সোলার সেল ফটোয়ানেড নামে একটি রাসায়নিক বিক্রিয়ার জন্ম দেয়, যা আলোক রশ্মি থেকে সহজেই ফোটন শুষে নিয়ে সেল থেকে ইলেকট্রন ত্যাগে সহায়তা করে। (সূত্র : নিউসায়েন্টিস্ট ম্যাগাজিন)।
চীনা গবেষকরা প্রজাপতির ডানাকে টিটানিয়াম মেশানো দ্রবণে মেশান। এরপর তারা প্রজাপতির পাখা থেকে টিটানিয়াম ডাইঅক্সাইডের একটি অবশেষ বা তলানি বের করে আনেন। এ তলানির সাহায্যে তারা ফটোয়ানেড তৈরি এবং তা সোলার সেলে ব্যবহারের পর দেখতে পান, সেলের কার্যকারিতা স্বাভাবিক অবস্থার চেয়ে ১০ গুণ বেড়ে গেছে।
সাংহাই জিয়াও তঙ ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানী ডাই ঝাং সোলার সেলের কার্যকারিতা বাড়ানোর কৌশল সম্পর্কে বলেন, ‘প্যারিস পিকক’ নামের প্রজাপতির আলো-শোষক ডানার বৈশিষ্ট্যগুলোকে প্রযৌক্তিক প্রক্রিয়ায় কাজে লাগানো গেলে অতিসস্তায় অথচ অধিকতর কার্যকর পন্থায় সোলার সেল উদ্ভাবন করা সম্ভব হবে।
ওয়েবসাইট থেকে আরও জানা যায়, চীনাদের পাশাপাশি জাপানি বিজ্ঞানীরাও একই প্রকল্প নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করছেন। তাদের এ গবেষণার জাগতিক সাফল্য অধিকতর বাস্তব হয়ে গেলে বিশ্বে সোলার সেলের প্রসার যেমন বেড়ে যাবে, তেমনি বিশ্বে বিদ্যুত্ সমস্যার একটা সমাধান পাওয়া যাবে বলে গবেষকরা আশা করছেন।
বর্তমানে সৌরবিদ্যুত্ প্ল্যান্টগুলোতে আলোকসংবেদী রং ব্যবহৃত হয়। মাইকেল গ্রাটজেলের নামানুসারে এসব সেল ‘গ্রাটজেল সেল’ নামেও পরিচিত। ল্যাবরেটরি টেস্টে প্রমাণিত হয়েছে, সোলার সেলে ব্যবহৃত আলোকসংবেদী রং-এর চেয়ে প্রজাপতির ডানার সোলার কালেক্টর অধিকতর দক্ষতার সঙ্গে আলো শুষে নিতে পারে।
চীনা বিজ্ঞানীরা বলেছেন, প্রজাপতির ডানায় থাকা সোলার কালেক্টর বানানো খুব জটিল নয়। আর এ কাজে সফলতা এলে সোলার সেলের বাণিজ্যিক ব্যবহার বহুগুণে বেড়ে যাবে।
একই গবেষণার ফল নিয়ে ‘ক্যামেস্ট্রি অব ম্যাটেরিয়ালস’ নামের অন্য একটি বিজ্ঞান সাময়িকীতে চীনা গবষেকদের উদ্ধৃতি দিয়ে লিখা হয়েছে—‘প্রজাপতির পাখার গাঠনিক কাঠামো থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে আমরা এমন একটি কার্যকর ফটোয়ানোড উদ্ভাবন করেছি, যা সোলার সেলে প্রথাগত আলোক সংবেদী রঙের পরিবর্তে ব্যবহার করা যাবে।’
বলা যায়, বর্ণিল ডানা ছড়িয়ে মনের আনন্দে বাতাসে ভেসে চলা অথবা ফুলের কোমল পাপড়িতে মোহনীয় ভঙ্গিতে বসে থাকা প্রজাপতি আগামীতে সবার নজর কাড়বে আরও বেশি করে। কারণ, এ পতঙ্গ শুধু অধিকতর কার্যকর সোলার সেল উদ্ভাবনেই সহায়তা দেবে না, এটা জলবায়ুর পরিবর্তন সম্পর্কে আগাম ধারণা দিতে পারবে।
হাতেগোনা কয়েক প্রজাতির প্রজাপতি ফসলের ক্ষতি করলেও ২৪ হাজার প্রজাতির বাকিগুলো নির্দোষ। ভিজুয়াল আর্ট ও শিল্পকর্মে ‘উড়ন্ত ফুল’ নামে পরিচিত এ পতঙ্গটি এ কারণে বেশ জীবন্ত। সাড়ে তিন হাজার বছর আগে মিসরের হায়ারোগ্লিফিক স্ক্রিপ্টে প্রজাপতির অঙ্কন দেখে এটা বোঝা যায়, এ পতঙ্গটি সেই প্রাচীনকাল থেকেই মানুষের দৃষ্টি কেড়েছে। বর্তমানে এটা শিল্পকলা ও অলঙ্কারের ডিজাইন তৈরির জনপ্রিয় মটিফ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এয়ারক্রাফট ও ঘুড়ি তৈরির ডিজাইন নির্মাণে বিজ্ঞানীরা এখন প্রজাপতির পাখার যান্ত্রিক কৌশল নিয়ে বেশ গবেষণায় মেতেছেন। ন্যানোপ্রযুক্তিবিদদের কাছেও এটার বাহারি পাখা গবেষণার বিষয়।
প্রজাপতির বাহারি উড়ে চলা দেখে চার্লস ডিকেন্স বড় আফসোস করে বলেছিলেন, ‘আমি স্বাধীন হতে চাই। আর প্রজাপতি জন্ম থেকেই স্বাধীন।’ অথচ খুব বেশি দিন বাঁচে না প্রজাপতি। প্রজাতিভেদে এটার আয়ু ৫ দিন থেকে ১০ মাস। দুটো এন্টেনা, দুটি জটিল চোখ আর একটি সুরযুক্ত মুখ নিয়েই এদের অনিশ্চিত পথচলা। বাংলাপিডিয়া মতে, আমাদের দেশে ১২৪ প্রজাতির প্রজাপতি শনাক্ত হয়েছে। এটা ঘণ্টায় ১২ মাইল থেকে ২৫ মাইল বেগে উড়তে পারে। বেশি শীতে এরা টিকতে পারে না বলে এন্টার্কটিকা মহাদেশে প্রজাপতি নেই। কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, এরা ঘুমায় না। বিশ্রাম নেয় মাত্র। এটা কিছু পাখির মতো পরিযায়ী।
দিবাচর এ পতঙ্গটি সাধারণত মধু খেয়ে বাঁচে। তবে এদের খাদ্য তালিকায় রয়েছে ফুলের রেণু, গাছের রস, পচা ফল, গোবর, পচনশীল মাংস, বালি অথবা ময়লায় দ্রবীভূত অবস্থায় থাকা খনিজ পদার্থ। পরিবেশ রক্ষায় এ পতঙ্গটির অবদান রয়েছে। এটা ফুলের পরাগায়নে ভূমিকা রাখে। কিন্তু সব কিছু ছাপিয়ে প্রজাপতির আলোক সংবেদী রঙিন পাখা নিয়েই বিজ্ঞানীরা মেতে আছেন।
Source: Daily Amardesh

প্রজাপতি ডলার আনে

প্রজাপতি ডলার আনে
আলতাফ হোসেন লাভলু

প্রজাপতি পাখায় পাখায় এ কোন মায়ার রং ছড়ায়। বোধ করি কবিরা ফল ও পাখির পরই প্রজাপতিকে নিয়ে বেশি চর্চা করেছেন। অবশ্য প্রজাপতির সৌন্দর্যই এর মূল কারণ। এ উপমহাদেশে প্রজাপতির আধিক্য রয়েছে বলে বিজ্ঞানীদের অভিমত। বিশেষ করে প্রাকৃতিক কারণে নেপালে পোকামাকড় সেই সঙ্গে প্রজাপতিরও জন্মের হার বেশি। হিমালয়ের কোল ঘেঁষে এ সুন্দর দেশটিতে মোট ৬০০ প্রজাতির প্রজাপতি রয়েছে। কাঠমু-ুর বিভিন্ন উপত্যকায় উড়ে বেড়ানো হাজার হাজার প্রজাপতিই বিশ্বের পর্যটকদের টেনে আনে এখানে। গোদাবরী, ফুলচকী ও নার্গাজন উপত্যকায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সেই সঙ্গে চিকচিকে রোদেলা বিকেলে রঙবেরঙের প্রজাপতি এ দেশটিকে বছরে প্রচুর পরিমাণে ডলার অর্জনের সুযোগ করে দেয়। তবে দুঃখের বিষয় এসব নিরীহ সুন্দর প্রাণীরাও শিকারি মানুষের পাল্লায় পড়ে বিলুপ্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। যদিও এদেশে ব্যবসায়িকভাবে প্রজাপতি ধরা নিষিদ্ধ। প্রজাপতি কি খায়? আসলে প্রজাপতির জীবনে চারটি ভাগ। প্রথম হলো ডিম। দ্বিতীয় শুঁয়োপোকা। তৃতীয় গুটিপোকা। এই অবস্থায় সারা শীতকাল ঘুমিয়ে কাটিয়ে দেয়। চতুর্থ অবস্থা হলো সুন্দর প্রজাপতি। দ্বিতীয়ত শুয়োপোকা থাকা অবস্থায় যতটা পারে খেয়ে নেয়। অনেক প্রজাপতি আছে যারা শুধু এই একবারই খেয়ে থাকে শুঁয়োপোকা থাকা অবস্থায়। খেতে খেতে ফুলে ফেঁপে ওঠে। বাইরের চামড়াটা ফেটে গিয়ে নতুন প্রজাপতি বেরিয়ে পড়ে। এই ফাটার কাজ বার বার হতে পারে। ফলে ডিম্বাবস্থায় যে আকার থাকে, তার চেয়ে অনেকগুণ বড় হয়ে যায়। প্রজাপতির শরীরে তিনিটি প্রধান অংশ থাকে মাথা, বুক ও পেট, যেসব প্রজাপতি খালি খেয়েই খাকে, তাদের মুখের বদলে একটা পাইপ থাকে। যখন ব্যবহার হয় না তখন গাড়ির স্প্রিংয়ের মতো এই পাইপটা পাকানো থাকে। ফুলে মধু চুষে খাবার জন্য এই নলকে বেশ কিছুদূর পর্যন্ত পাঠিয়ে দিতে পারে। মথ জাতীয় প্রজাপতিদের পাইপ ৬ থেকে ১২ ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা হয়। কারুর ওপর করাতের মতো পাইপ হয়। ফলটাকে ফেটে তার ভেতরে থেকে চুষে নেয়। এই পাইপটাকে বলা হয় অ্যানটেনা। এই অ্যানটেনার সাহায্যে প্রজাপতিরা তিনটা কাজ করে- অনুভব, গন্ধ শোকে, এবং শ্রবণ করে। পৃথিবীর নানা দেশে বর্ণালী ও বিচিত্র রঙের আকর্ষণীয় প্রজাপতি বাস করে। নানা প্রজাপতির এ প্রজাপতি দেখতে যেমন সুন্দর, তেমনি আকর্ষণীয়। তাই পর্যটকদের করে আকর্ষণ। জাপানির এক নাগরিক প্রজাপতি চুরি করতে গিয়েছিল শ্রীলঙ্কার অভয়ারণ্যে। প্রহরীর চোখ এড়িয়ে যখন ৩২টি প্রজাপতি নিয়ে পালাচ্ছিলেন তখন বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ বিভাগের কর্মকর্তাদের হাতে ধরা পড়ে। আদালতে তাকে চালান দেওয়ার পর যতœপুর শহরের ম্যাজিস্ট্রেট অজ্ঞাতনামা ও জাপানিকে দু’সপ্তাহে কারাগারে রাখার নির্দেশ দেন। সন্ধান পাওয়া তথ্যমতে অসংখ্য প্রজাপতির মধ্যে সবচেয়ে বড় আকৃতির প্রজাপতির নাম ‘ট্রয়েডস ভিক্টোরিয়া’। এ প্রজাপতির পুরুষদের অতিকায় দু’ডানার মাপ ১২ ইঞ্চিরও বেশি। আর ওজন ৫ গ্রামেরও বেশি। এটি পাওয়া গেছে দক্ষিণ-পশ্চিমে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সলোমান দ্বীপপুঞ্জে।