Friday, December 21, 2012

নস্ট্রাডামাসের ভবিষ্যদ্বাণী

বহুকাল আগে নস্ট্রাডামাস ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন ২০১২ সালে এক প্রলয়ঙ্করী প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মাধ্যমে পৃথিবীর অস্তিত্বের অবসান ঘটবে। কেউ কেউ এ সতর্কবাণীকে নিয়েছেন অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে, কেউ আবার এটিকে আমলেই নেননি। নস্ট্রাডামাসের এমন আশঙ্কা মিথ্যা প্রমাণ করে দিয়ে এ পৃথিবী যদি ২০১২ সালে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার হাত থেকে বেঁচেও যায়, তবু একেবারে নিশ্চিন্ত মনে বসে থাকার কোনো উপায় নেই। কেননা এবার আর অলৌকিক ক্ষমতায় অনিশ্চিত কোনো ভবিষ্যদ্বাণী নয়, একেবারে অঙ্ক কষে খোদ বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ২০১৩ সালে পৃথিবী সম্মুখীন হবে প্রকৃতির এক ভয়ংকর রোষের। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, ২০১৩ সালে সৌরজগতের প্রাণ সূর্য এর নিজস্ব চক্রাবর্তের একটি বিশেষ মুহূর্তে প্রবেশ করবে। এ সময় সূর্যবক্ষে সঞ্চিত শক্তির বিশাল বিস্ফোরণ ঘটবে। এ বিস্ফোরণের আকার এতই ব্যাপক হবে যে, এটি গোটা সৌরজগৎ ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করবে। ওই বিস্ফোরণ থেকে নিঃসৃত চৌম্বকশক্তি পৃথিবীর যাবতীয় যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিপর্যয় ঘটাবে। এতে তাপ ও বিদ্যুৎসহ পৃথিবীর যাবতীয় শক্তি বিতরণ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাবে। সব ধরনের টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে, ইন্টারনেট ব্যবস্থা সম্পূর্ণ অচল হয়ে যাবে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, নিজের চক্রাবর্তে সূর্যের এ ধরনের অবস্থান সাধারণত প্রতি একশ’ বছরে একবার করে হয়ে থাকে। এর আগে অবশ্য ১৮৫৯ ও ১৯৮৯ সালেও এ ধরনের ঘটনা ছোট পরিসরে ঘটে গেছে। তবে এবার ক্ষতির ব্যাপকতা হবে অনেক বেশি। বর্তমান বিশ্ব আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রযুক্তি ও যন্ত্রনির্ভর হয়ে ওঠায় এর প্রভাবও হবে অচিন্তনীয়। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা থেকে ব্রিটেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী লিয়াম ফক্স ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে আলোচনার জন্যে গত সোমবার লন্ডনে এক জরুরি বৈঠক ডাকেন। বৈঠকে তিনি বিশ্ববাসীর মনোযোগ ও সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর জোর দেন।

Tuesday, October 23, 2012

পাহাড় প্রান্তের অবাক শহর

পাহাড় প্রান্তের অবাক শহর



বোনিফ্যাসিও

  ফ্রান্সের কর্স-ডু-সাড বিভাগের অন্তর্গত কর্সিকা দ্বীপের দক্ষিণ প্রান্তে বোনিফ্যাসিও শহর তথা সম্প্রদায়ের অবস্থান। কর্সিকা দ্বীপের সবচেয়ে বড় সম্প্রদায় হলো বোনিফ্যাসিও। এখানকার বাসিন্দাদের বলা হয় বোনওফ্যাসিয়ান্স। মহিলাদের বলা হয় বোনিফ্যাসিনিজ। পাহাড়ের প্রান্তে থাকা হলদেটে সাদা রংয়ের চুন সুরকির দালান ঘেরা শহরটি এক সময় দুর্ভেদ্য দুর্গ হিসেবে পরিচিত ছিল।


 রন্ডা
  স্পেনের মালাগা প্রদেশের ১০০ কিলোমিটার উত্তর পশ্চিমে রন্ডা শহরের অবস্থান। শহরটি অ্যান্ডালুসিয়া সমপ্রদায় কর্তৃক পরিচালিত। রন্ডা শহর দু'ভাগে বিভক্ত। নুভো সেতু দু'টি অংশকে যুক্ত করেছে। ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে পর্যটকদের কাছে শহরটি বেশ আকর্ষণীয়।






ডি লা রোকা

  স্পেনের গিরোনা প্রদেশের গ্যারোটজা জেলার অন্তর্গত শহর হলো ক্যাসেলফলিট ডি লা রোকা পৌর শহর। ফ্লুভিয়া ও টরোনেল নদীর মাঝামাঝি কৃষ্ণধূসর আগ্নেয়শিলার এক দুরারোহ পর্বতগাত্রের বুকে শহরটি অবস্থিত। এখানে ক্যাটলোনিয়া সম্প্রদায়ের অবস্থান। পৌরশহরটির জায়গার পরিমাণ এক বর্গকিলোমিটারের কম।



রোকা মাড্যুর

* ফ্রান্সের দক্ষিণ পশ্চিমে অবস্থিত লট বিভাগ ও প্রান্তন কোয়ের্কি প্রদেশের অন্তর্গত অন্যতম নিম্ননির্বাহী বিভাগ হলো রোকামাড্যুর। ডোরডোঙ্গে নদীর উপর অবস্থিত শহরটি ঐতিহাসিক স্মৃতিস্তম্ভ এবং খ্রিস্ট ধর্মের কুমারী মেরি'র ধর্মস্থান হিসেবে বিখ্যাত। তাই রোকামাড্যুর শতাব্দীর পর শতাব্দী রাজা, বিশপ ও বিখ্যাত ব্যক্তিসহ বিভিন্ন দেশের পর্যটকদের পদচারণায় মুখর থাকে।



মিটিয়োরা


  মিটিয়োরা একটি গ্রিক শব্দ। এর অর্থ হলো ঝুলন্ত পাহাড়। গ্রিসে অবস্থিত পাহাড়ের ওপর নির্মিত গির্জাটি গ্রিসের ক্যাথলিক খ্রিস্টান যাজকদের অন্যতম বৃহত্তম ও গুরুত্বপূর্ণ মঠ। মধ্য গ্রিসের থেসালি ভৌগলিক অঞ্চলের উত্তরপশ্চিমপ্রান্তে পিনিয়স নদী ও পিন্ডাস পাহাড়ের মাঝামাঝি ক্যাথলিক খ্রিস্টান যাজকদের প্রাকৃতিক বেলে পাথর দিয়ে নির্মিত পিলারের ছয়টি মঠ রয়েছে। এরমধ্যে পাঁচটি পুরুষ যাজকদের ও একটি মহিলা যাজকদের মঠ। 

Tuesday, October 9, 2012

মুসলমানরাই বাংলাদেশের আদিবাসী -মাহমুদ ইউসুফ

মুসলমানরাই বাংলাদেশের আদিবাসী 
-মাহমুদ ইউসুফ

প্রখ্যাত ভাষাতাত্ত্বিক, শিক্ষাবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রফেসর (অবসরপ্রাপ্ত) ডঃ কাজী দীন মুহাম্মদ বলেছেন, ‘আজ সাড়ে সাত হাজার বছর আগে হযরত নুহু (আঃ) এর সময়ে সংঘটিত মহাপ্লাবনের পর আল্লাহর অস্তিত্ব ও একত্ববাদে বিশ্বাসী তাঁর প্রপৌত্র বঙ এ অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেন। এরপর যে জনগোষ্ঠি গড়ে ওঠে তা-ই বঙ্গ জনগোষ্ঠি নামে অভিহিত হয়। কালের বিবর্তনে উক্ত বঙ থেকেই বঙ্গ দেশের নামকরণ হয়েছে' (বাংলাদেশের উৎপত্তি ও বিকাশ ১ম খন্ড, ইফাবা, ২য় সংস্করণ, জুন-২০০৮, পৃ-১৬৭)। মানবজাতির আদি পিতা হযরত আদম (আঃ)। তিনিই এ পৃথিবীতে মানব সভ্যতার জয়যাত্রা শুরু করেন। ইসলাম, ইহুদী ও খৃস্টান ধর্মমতে এটাই চরম সত্য। কুরআন, বাইবেল, তাওরাতে এ সত্যেরই প্রতিধ্বনি উচ্চারিত হয়েছে।
পৃথিবীর প্রথম মানব হযরত আদম (আঃ)কে আল্লাহ রাববুল আলামীন এ ভারতবর্ষেই প্রেরণ করেন। তদানীন্তন সরন্দীপ (আজকের শ্রীলঙ্কা) আর হিন্দুস্তান একই ভূখন্ডের অন্তর্ভুক্ত ছিল। হযরত আদম (আঃ) এর পুত্র দ্বিতীয় নবী হযরত শীষ (আঃ)ও এই ভারতবর্ষেরই নাগরিক ছিলেন। এখানেই তিনি বসতি স্থাপন করেন। আর এখানেই মৃত্যুবরণ করেন। পরবর্তীতে হযরত নুহু (আঃ) এর উত্তরপুরুষেরা ভারতবর্ষ আবাদ করেন। তাই দেখা যায়, মুসলিমদের কাছে শুধু আরবভূমিই নয় এই ভারতীয় উপমহাদেশও অতি আপনভূমি। কেননা মানব সভ্যতার শুরু থেকেই মুসলমানরা এই ভূখন্ডে বসবাস করে আসছে। নেগ্রিটো, অস্ট্রল্যান্ড, অস্ট্রো এশিয়াটিক, মঙ্গোলয়েড, অস্ট্রিক, দ্রাবিড়, বৌদ্ধ, আর্য জাতির বিকাশ আরও পরের ঘটনা।পার্বত্য উপজাতির আগমন তো সেদিনের ঘটনা। সর্বোচ্চ তিনশ বছর।
খৃস্টপূর্ব সাড়ে পাঁচ হাজার বছর পূর্বে একমহাপ্লাবন সংঘটিত হয়! অনেকের মতে খৃস্টপূর্ব ৩২০০ অব্দে এটি সৃষ্টি হয়েছিল। এ মহাপ্লাবন মিসর থেকে হিন্দুস্তান, ককেশাস থেকে আরব সাগর পর্যন্ত ছড়িয়েছিল। এটি ছিল মূলতঃ আল্লাহর গজব। হযরত নুহু (আঃ) দীর্ঘ সাড়ে নয়শ বছর ইসলাম প্রচার করেন। কিন্তু গুটিকয়েকজন নাগরিক ছাড়া আর কোনো নাগরিক আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস স্থাপন করেন নাই। এই অমুসলিম তথা মুশরিক কাফিরদের শাস্তি দেয়ার লক্ষ্যেই মহান রব গজব নাজিল করেন। এ মহাপ্লাবনে মাত্র ৮৫ জন মানুষ, যারা নূহ (আঃ) এর কিস্তিতে আরোহণ করেছিলেন তারাই জীবিত থাকে। বাকি সমগ্র মানবজাতি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। পানিবন্যা পরবর্তী সময়ে হযরত নুহ (আঃ) এর সন্তানেরা বিভিন্ন দেশে বসতি স্থাপন করেন। তাঁর দৌহিত্র হিন্দ ভারতবর্ষ আবাদ করেন। বঙের বংশধরদের আবাসস্থলই আজকের বাংলাদেশ। বং থেকে কালক্রমে বঙ্গ, বাঙালাহ, বেঙ্গল, বাংলা ইত্যাদি নামের উদ্ভব ঘটে।
বঙ্গ নামের উৎপত্তির সঙ্গে অনেক লেখক, গবেষক ও ঐতিহাসিক ভিন্নমত পোষণ করেন। তাদের মতে, বঙ্গ শব্দের উৎপত্তি ভারতীয় আর্যদের আমলে, যারা খৃস্টপূর্ব দেড় হাজার বছর পূর্বে মধ্য এশিয়া থেকে এসে সিন্ধু নদীর তীরে দ্রাবিড়দের উৎখাত করে বসতি স্থাপন করে। প্রমাণস্বরূপ তারা উল্লেখ করেছেন, ঋগবেদের ঐতরেয় আরণ্যক এ বঙ্গ শব্দের উল্লেখ পাওয়া যায়। মহাভারত, পুরাণ, হরিবংশ প্রভৃতি গ্রন্থে বর্ণিত আছে, ‘আর্য রমণীগণ কর্তৃক পরিত্যক্ত, দুশ্চরিত্র অন্ধ ঋষি দীর্ঘতমা গঙ্গার জলে ভেসে আসাকালীন নিঃসন্তান ‘‘অনার্য' বলিরাজ তাঁকে তুলে নিয়ে যান এবং স্বীয় পত্নী সুদেষ্ণার গর্ভে পুত্র উৎপাদনের জন্য তাঁকে নিয়োগ করেন। সুদেষ্ণার গর্ভে উক্ত ঋষির ঔরসে পাঁচটি পুত্র সন্তান জন্মলাভ করে। এই ক্ষেত্রজ পুত্র সন্তানদের নাম রাখা হয় ১) অঙ্গ, ২) বঙ্গ, ৩) কলিঙ্গ ৪) পুন্ড্রু এবং ৫) সূক্ষ্ম। তাদেরকে পাঁচটি রাজ্য দেয়া হয় এবং তাদের নামানুসারে পাঁচটি রাজ্যের নামকরণ করা হয়'। যারা এই তথ্যকে সঠিক বলে প্রমাণ করতে চায়, তাদের নিম্নের বিষয়গুলো বিবেচনার জন্য পেশ করা হলো। এক- কোনো যুক্তিবাদী ও বাস্তবজ্ঞান সম্পন্ন মানুষ কী উপরোক্ত তথ্য বিশ্বাস করতে পারেন?
দুই- বলিরাজ বা ধর্মপাল অষ্টম শতকে বাংলাদেশের ইতিহাসের একজন মহান, ন্যায়পরায়ণ, জনদরদী, সজ্জন এবং পন্ডিতপ্রবর শাসক ছিলেন? তাঁর স্ত্রী সুদেষ্ণাও একজন মহিয়সী নারী ছিলেন। এই মহৎ শাসক তাঁর স্ত্রীর গর্ভে দুশ্চরিত্র দীর্ঘতমার জারজ সন্তান ধারণ করার অনুমতি দেবেন অথবা একজন সতী নারী একজন লম্পটের ভ্রূণ গ্রহণ করবেন এটা কী বিশ্বাসযোগ্য? তিন-ভারতে আর্য আধিপত্য প্রতিষ্ঠার আগে এ অঞ্চলের নাম কী ছিলো সে বিষয়ে তারা কিছু ধারণা দেননি কেন? চার-ঋগবেদ, পুরাণ, মহাভারতে এ অঞ্চলের অধিবাসীদেরকে কেন অত্যন্ত হেয় ও ঘৃণ্যবলে প্রতিপন্ন করা হয়েছে? পাঁচ- কোনো মানুষকে কী দস্যু, অসুর, দেও দানব, রাক্ষস, পক্ষী, অনার্য আখ্যা দেয়া যায় কিনা বা উচিত কিনা? ছয়-বাংলা ভাষাকে আর্যরা আসুরিক ও ম্লেচ্ছদের ভাষা হিসেবে আখ্যায়িত করেছে কেন? সাত- সেনবর্মনরা কেন বাংলা ভাষা নিধনে মেতে ওঠেছিল? আট-রিয়াজ-উস-সালাতিন গ্রন্থে বর্ণিত বাংলা নামকরণ সম্পর্কে প্রদত্ত বক্তব্য হিন্দু ঐতিহাসিকরা খন্ডন করেননি বা ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেননি। থলের বিড়াল বেরিয়ে যাবার ভয়ে কী? নতুন কোনো তথ্য বা যুক্তি উপস্থাপন করতে হলে অবশ্যই অতীতের বক্তব্য খন্ডন করতে হবে। এটাই ইতিহাসের স্বাভাবিক নিয়ম। নয়-বলিরাজ বা ধর্মপাল নিজেই বঙ্গের শাসক ছিলেন। তাই জারজ সন্তান সৃষ্টি করে তার নামে বঙ্গের নামকরণের যৌক্তিকতা থাকতে পারে না। বলিরাজের অনেক পূর্ব থেকেই এ অঞ্চলের নাম বঙ্গ হিসেবে পরিচিত। তাছাড়া অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, পুন্ড্রু, সূক্ষ্ম নামে তাঁর কোনো সন্তান ছিলো না। ধর্মপালের পূর্বে এদেশ শাসন করে তার পিতা গোপাল, ধর্মপালের মৃত্যুর পর পুত্র দেবপাল, তারপর বিগ্রহপাল মসনদে বসেন। দশ-প্রাচীনকাল থেকেই বাঙালি পরাক্রমশালী একটি জাতি। যেসব ঐতিহাসিক স্বজাতিকে জারজ হিসেবে আখ্যায়িত করতে চায় তাদের মানসিক সুস্থতা নিয়ে আমাদের প্রশ্ন রয়েছে। এসব প্রশ্নের জবাব খোঁজা অতীব জরুরী।
ডঃ এম এ আজিজ ও ডঃ আহমদ আনিসুর রহমান বলেছেন, ‘আর্যদের আগমনের বহুপূর্বেই প্রাগৈতিহাসিক যুগে উপমহাদেশের এ অঞ্চলে ‘বঙ্গ' নামে জনপদ বিদ্যমান ছিল। আর্যদের পৌরাণিক কাহিনী থেকে যে ‘বঙ্গ' শব্দের উৎপত্তি নয় তা-ও সুস্পষ্ট। কাজেই ‘বঙ্গ' শব্দের উৎপত্তি ভারতীয় আর্য হিন্দু আমলে হয়েছে বলে গ্রহণযোগ্য নয় (বাংলাদেশের উৎপত্তি ও বিকাশ ১ম খন্ড, ইফাবা, ২য় সংস্করণ, জুন-২০০৮, পৃ-৪)। রমেশ চন্দ্র মজুমদার বলেছেন, ‘আর্য জাতির সংস্পর্শে আসিবার পূর্বেই বর্তমান বাঙালী জাতির সংস্পর্শে বাঙালি জাতির উদ্ভব হইয়াছিল এবং তাহারা একটি উচ্চাঙ্গ ও বিশিষ্ট সভ্যতার অধিকারী ছিল' (বাংলাদেশের ইতিহাস)। তিনি অন্যত্র বলেছেন, ‘(বাংলাদেশের) প্রাচীন লিপিতে দীনার ও রূপক এই দুই প্রকার নাম পাওয়া যায়। সম্ভবত স্বর্ণমুদ্রার নাম ছিল দীনার ও রৌপ্য মুদ্রার নাম ছিল রূপক। ১১৬ রূপক এক দীনারের সমান ছিল'। দীনার শব্দটি সেমিটিক পরিভাষার সাথে সম্পর্কিত। প্রখ্যাত গবেষক ও লেখক সিরাজ উদ্দীন আহমেদ বলেছেন, ‘বাঙাল জনগোষ্ঠীর নামকরণ বাঙ, কৌম বা গোত্র থেকে হয়েছে। ভাগিরথীর পূর্বদিকে গাঙ্গেয় বদ্বীপ এলাকায় সুপ্রাচীনকাল থেকে বাঙ জনগোষ্ঠী বাস করত। ....প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে বাঙ জাতি এ অঞ্চলে বাস করত এবং তাদের নামানুসারে বঙ্গ জনপদের নামকরণ' (পৃ-৫১, বরিশালের ইতিহাস প্রথম খন্ড, ভাস্কর প্রকাশনী, জুলাই-২০০৩)। অন্যত্র তিনি বলেছেন, ‘বাকলা-চন্দ্রদ্বীপ বাঙালী জাতির প্রধান আদি বাসস্থান। সুদূর প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে বাঙ জাতি এ অঞ্চলে বাস করত। বাঙালী শঙ্কর জাতি। নরতত্ত্ব, জাতিতত্ত্ব ও ভাষাতত্ত্বের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ করলে বাঙালী জাতির উৎপত্তি সম্পর্কে ধারণা লাভ করা যায়' (পৃ-৪৯, পূর্বোক্ত)। এই বাঙ নামকরণ হযরত নুহর প্রপৌত্র বঙ থেকেই উদ্ভূত। আর্য হিন্দু প্রভাবিত ইতিহাসবিদ, লেখক, গবেষকরা এ তথ্যকে গোপন বা অস্বীকার করলেও এটিই প্রকৃত ও সত্য ইতিহাস।
সাম্রাজ্যবাদের তল্পিবাহক বুদ্ধিজীবী ও সুশীল সমাজ বাংলাদেশি মুসলমানদের শেকড়শূন্য ও বহিরাগত হিসেবে প্রতিপন্ন করতে সঙ্কল্পবদ্ধ। পার্বত্য উপজাতিরা ওই অঞ্চলে সর্বোচ্চ তিনশ বছর পূর্বে এ অঞ্চলে আগমন করে। আর মুসলমানরা সভ্যতার শুরু থেকেই বাংলাদেশের বাসিন্দা। তাই বাংলাদেশি মুসলমানরাই বাংলাদেশের আদিবাসী ও প্রাচীন অধিবাসী। মুসলমানরাই ভারতবর্ষের সুপ্রাচীন জাতিগোষ্ঠী।  

 

বাংলাদেশের জন্য বিরল সম্মান: ডিসকভারী চ্যানেলের ‘সুপার হিউম্যান' মার্শাল আর্ট গ্র্যান্ড মাস্টার ড. ইউরী

বাংলাদেশের জন্য বিরল সম্মান:
ডিসকভারী চ্যানেলের ‘সুপার হিউম্যান' মার্শাল আর্ট গ্র্যান্ড মাস্টার ড. ইউরী
 
সাদেকুর রহমান : একজন অসাধারণ, বিশ্ব রেকর্ডধারী ব্যক্তি তিনি। এ উপমহাদেশের প্রাচীন আত্মরক্ষামূলক শিল্পকলা ব্যুত্থান আর্ট যার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় বিশ্বব্যাপী আজ পরিচিত ও সমাদৃত। সর্বান্তকরণে বাংলাদেশী এই মানুষটি পৃথিবীর অন্যতম শীর্ষস্থানীয় মার্শাল আর্ট গ্র্যান্ড মাস্টার। মার্শাল আর্টের ওপর দেশের একমাত্র পিএইচডি ডিগ্রীধারী ব্যক্তিত্ব মিলিটারী আন-আর্মড কমব্যাট, ল-এনফোর্সমেন্ট, কাউন্টার-টেরোরিস্ট অ্যান্ড সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞ ও প্রশিক্ষক হিসেবে নিজ মানচিত্রের বাইরেও বিপুল সমাদৃত। তিনি ড. মুহাম্মদ আনোয়ার কামাল ইউরী। ড. ম্যাক ইউরী বা ড. ইউরী নামেই জগদ্বিখ্যাত তিনি।
নিজ দেশের প্রায় অপরিচিত হলেও তিনি তার অতিমানবীয় সিনবোন কিকের জন্য দুনিয়া জোড়া ‘থান্ডার সিনম্যান' হিসেবে ইতিমধ্যেই ব্যাপক পরিচিতি ও প্রশংসা অর্জন করেন। তাকে নিয়েই আন্তর্জাতিক টিভি চ্যানেল ডিসকভারী নির্মাণ করেছে একটি বিশেষ ডকুমেন্টারী। চ্যানেল কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিশ্বের আরো আটজন মেধাবী, সমকালীন সেরা কীর্তিমান ব্যক্তিত্বের পাশাপাশি ড. ইউরীর পেশাগত জীবনীভিত্তিক ডকুমেন্টারীটি উক্ত চ্যানেলে প্রদর্শিত হচ্ছে। ওয়াকিবহাল মহল বলছেন, যে কোনো বিচারে এটি বাংলাদেশের জন্য বিরল সম্মান ও অর্জন।
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মার্শাল আর্ট গ্র্যান্ড মাস্টার ড. ইউরী ডিসকভারী চ্যানেলে তার উপর ডকুমেন্টারী প্রদর্শনের প্রতিক্রিয়ায় দৈনিক সংগ্রামকে জানান, খুব ভালোই লাগছে। আবার কষ্টও লাগে- যখন দেখি দেশের মানুষের অবজ্ঞা-অবহেলা। দেশের মানুষ সম্মান না দিলে বিদেশীরা যতই সম্মানিত করুক তাতে কি তৃষ্ণা মিটে। কথা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ডিসকভারী কর্তৃপক্ষ প্রাথমিকভাবে ৪০ জন যশস্বী ব্যক্তিত্বকে নির্বাচন করেছিল। সেখান থেকে তারা তাদের মানদন্ড বিবেচনায় মোট নয়জনকে চূড়ান্তভাবে নির্বাচন করে ‘সুপার হিউম্যান শোডাউন' শিরোনামের ডকুমেন্টারী বানায়। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, চ্যানেলটির নিয়ন্ত্রণ করে শক্তিধর একটি দেশ, তারা ঠিকমতো শিডিউল পর্যন্ত দেয়নি। তাই সুপার হিউম্যান (অতিমানব) অনুষ্ঠানটি নিয়মিত দেখানো শুরু হলেও কোন ব্যক্তিত্বকে কখন দেখানো হবে তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে একেকজন ‘সুপার হিউম্যান'কে পঞ্চাশ বার করে দেখানো হবে বলে জানান ড. ইউরী। গ্রান্ডমাস্টার ড. ইউরী ভারতের কাঞ্চিপুরম ও চীনের শাওলিনটেম্পল-এ অনুসন্ধানী গবেষণার মাধ্যমে ভারতীয় মার্শাল আর্ট-এর লুপ্ত প্রায় ইতিহাস ও ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার করেন। তিনি মার্শাল আর্ট-এর সর্বোচ্চ পদাধিকারী (দশম লেভেল, ব্ল্যাক বেল্টধারী) এবং ব্যুত্থান মার্শাল আর্ট সিস্টেমের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি মার্শাল আর্ট জগতের বিশিষ্ট চিন্তাবিদ, বিশেষজ্ঞ অথরিটি হিসেবে বিবেচিত এবং পৃথিবীর ৬টি শীর্ষস্থানীয় কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সর্বোচ্চ ক্যাটাগরিতে গ্রান্ডমাস্টার অফ দি ইয়ার হিসেবে অভূতপূর্ব স্বীকৃতি অর্জন করে পৃথিবীব্যাপী চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেন। ড. ইউরী বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় মার্শাল আর্ট গ্র্যান্ডমাস্টারদের আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়ার্ল্ড গ্রান্ডমাস্টারস কাউন্সিল, আমেরিকা-এর সর্বোচ্চ পুরস্কার ‘গ্রান্ড মাস্টার পিনাকেল অ্যাওয়ার্ড-২০০৯' লাভ করেন। অসাধারণ প্রতিভাবান ক্যাডেট হিসেবে তিনি বরাবরই কৃতিত্বপূর্ণ সাফল্যের সাথে পরিচয় দিয়ে এসেছেন। মিলিটারি সাইন্স, ফিজিক্যাল ট্রেনিং, অবস্ট্রাকল কোর্স, আন আর্মড কমব্যাট, মিলিটারি ড্রিলস প্যারেডের মতো বিষয়সমূহে। সেই সাথে, চৌকস নৈপুণ্যের জন্য তিনি বরাবরই পাইলট ইউনিট কালার পার্টির অগ্রভাগে জাতীয় পতাকা বহনের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বটি সূচারুসরূপে পালন করতেন। তিনি হাতে গোনা কয়েকজন ডিস্টিংগুইস্ট ক্যাডেট পদকপ্রাপ্তদের অন্যতম হওয়ার বিরল সৌভাগ্য লাভ করেন। মাত্র ১১ বছর বয়সে। তিনি বার্মিজ ক্লাসিক্যাল আন আর্মড কমব্যাট ও অস্ত্রবিদ্যা ভিত্তিক (বান্ডো ও বানশে) মার্শাল আর্ট চর্চা শুরু করেন।
ব্যুত্থান মার্শাল আর্ট এবং কমব্যাট সেল্ফ ডিফেন্স (সিএসডি) ড. ইউরীর বৈপ্লবিক ও যুগান্তকারী চিন্তার ফসল, যা বিশ্বের দেশ ও সংস্কৃতির মানুষের আধুনিক জীবন-যাত্রার নিজের সুরক্ষা ও সল্প সময়ে নিরাপত্তা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাদের জন্য আধুনিক শিক্ষা কৌশল হিসেবে সমাদৃত হয়েছে। সার্কভুক্ত দেশসমূহের দু'শতাধিক কোটি মানুষের মধ্যে ড. ইউরীই প্রথম ও একমাত্র ব্যক্তি যিনি বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ‘ওয়ার্ল্ড মার্শাল আর্ট হল অব ফেইম' পদক লাভ করে- গ্র্যান্ড মাস্টার অব দ্য ইয়ার ২০০৭ নির্বাচিত হন। তিনি ‘ন্যাশনাল সিকিউরিটি একাডেমি', আমেরিকা থেকে কমিশন অফিসার্স কোর্স সমাপ্ত করেন। বৃটিশ হোম অফিস অধীনস্ত সিকিউরিটি ইন্ডাস্ট্রি অথরিটি ভিআইপি প্রটেকশনের ওপর সর্বোচ্চ প্রফেশনাল ডিগ্রি অর্জন করেন। বৃটিশ আর্মি রয়েল ইঞ্জিনিয়ার্স-এর অধীনে বিস্ফোরক সার্চ এন্ড রিকগনিশন কোর্সও সম্পন্ন করেন। ফায়ার ট্রেনিং একাডেমি, ইংল্যান্ড থেকে ফায়ার মার্শাল কোর্স সম্পন্ন করেন ও বৃটিশ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীনে তিনি (এভিয়েশন লেভেল-৪) প্রশিক্ষণ শেষে সনদ অর্জন করেন। উল্লেখ্য, ড. ইউরী ইন্টারন্যাশনাল কমব্যাট মার্শাল আর্টস ইউনিয়নের এসোসিয়েশন একজন প্রথিতযশা হিসেবে অনন্য স্বীকৃতি লাভ করে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেন। তিনি এফবিআই, এসএএস, সিআইএ, বৃটিশ আর্মি, লাটভিয়ান, স্পেশাল ফোর্স, আইরিস কারেকশন ডিপার্টমেন্ট ইত্যাদি আন্তঃদেশীয় বিভিন্ন আইনপ্রয়োগকারী ও গোয়েন্দা সংস্থাসমূহের সঙ্গে ক্রস ট্রেনিং-এর পাশাপাশি দেশের সরকারি নিরাপত্তা রক্ষী বাহিনীসমূহের প্রশিক্ষণে নিয়োজিত দেশ-এর প্রথম ও শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান ‘রেঞ্জারস একাডেমি অব সিকিউরিটি এন্ড ডিফেন্স'-এর কমান্ডেন্ট হিসেবে স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (এসএসএফ), সেনাবাহিনী, নৌ বাহিনী, পুলিশ, কোস্ট গার্ড, বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী, এনএসআই, পুলিশ স্টাফ কলেজ, স্কুল অব মিলিটারি ইন্টিলিজেন্সসহ স্বরাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়স্থ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশিক্ষাণাদি পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে আসছেন। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী কর্তৃক ব্যবহৃত সিকিউরিটি ব্যাটন ড. ইউরীই উদ্ভাবন করেন। এছাড়া, ড. ইউরী ইন্টারন্যাশনাল বডি গার্ড এসোসিয়েশন, ইন্টারন্যাশনাল পুলিশ ট্যাকটিস ট্রেইনার্স এসোসিয়েশন (আইপিটিটিএ), যুক্তরাজ্যের ল-এনফোর্সমেন্ট ট্রেনিং এজেন্সিজ (আইইএলইটিএ)-এর সার্টিফাইড ইন্সট্রাক্টর, আমেরিকান সোসাইটি ফর ল-এনফোর্সমেন্ট ট্রেইনার্স (এলএলইটি), আমেরিকান সোসাইটি অব ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিকিউরিটি (এএসআইএস) ইত্যাদি সংগঠনসমূহেরও তিনি সদস্য।

Source: http://www.dailysangram.com
7 October 2012 
 

Monday, October 1, 2012

ফ্ল্যাট কিনেও ভাড়া থাকছেন অনেক ক্রেতা আবাসন খাতে ৩ বছর ধরে নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ হুমকির মুখে ৯০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ

ফ্ল্যাট কিনেও ভাড়া থাকছেন অনেক ক্রেতা:
আবাসন খাতে ৩ বছর ধরে নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ -
হুমকির মুখে ৯০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ
 
কামাল উদ্দিন সুমন : আবাসন শিল্পে চরম দুঃসময় চলছে। একদিকে গত ৩ বছর ধরে নেই নতুন গ্যাস সংযোগ। অন্যদিকে ফ্ল্যাট ও প্লটের ক্রেতা কম হওয়ায় বিক্রি কমেছে। গ্যাস সংযোগ না পাওয়ায় অনেক কোম্পানি তাদের বিক্রিত ফ্ল্যাট ক্রেতার কাছে হস্তান্তর করতে পারছে না। আর ফ্ল্যাট কিনেও ভাড়ায় থাকছেন অনেকে। আর গ্যাসের অভাবে এ খাতে ৯০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ এখন হুমকির মুখে বলে জানিয়েছেন এ খাতের একাধিক বিনিয়োগকারী।
সূত্র জানায়, ২০০৯ সালের ২১ জুলাই থেকে সব ধরনের নতুন  সংযোগ বন্ধ করে দেয়া হয়। একইভাবে ২০১০ সালের ১৩ জুলাই থেকে দেশব্যাপী আবাসিক গ্রাহকদের গ্যাসের সংযোগ দেয়া বন্ধ রাখা হয়। তবে আবাসিক গ্রাহকদের জন্য এই বলে নিশ্চয়তা দেয়া হয় যে দেশে যখন দৈনিক দুই হাজার দুইশ' এমএমসিএফডি গ্যাস উৎপাদন করা সম্ভব হবে তখন থেকেই সব আবাসিক গ্রাহকদের সংযোগ আবার দেয়া হবে। সরকার সম্প্রতি শিল্প কারখানায় নতুন গ্যাস সংযোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও কবে তা বাস্তবায়ন হবে তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন অনেক ব্যবসায়ী।
সূত্র মতে, গত তিন বছর ধরে আবাসন শিল্পে গ্যাসের নতুন সংযোগ বন্ধ রয়েছে। শিল্প ও আবাসন খাতে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে দিশেহারা বিনিয়োগকারীরা। সুদসহ ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে অনেকেই দেউলিয়া হওয়ার পথে। শুধু গ্যাস সংযোগের অভাবে ফ্ল্যাট বিক্রি করতে পারছেন না অনেক প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তারা। নতুন গ্যাস সংযোগের অভাবে ৯০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ এখন হুমকির মুখে। এর মধ্যে ৩০ হাজার কোটি টাকার ব্যাংক ঋণ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন উদ্যোক্তারা। এ সময় ফ্ল্যাট বিক্রি কমেছে ৪২ শতাংশ।
আবাসন ব্যবসায়ীদের একটি সূত্র জানায়, শুধুমাত্র এ সরকারের আমলেই তিন বছর ধরে গ্যাস সংযোগ বন্ধ রেখে নতুন নজির স্থাপন করা হয়েছে। এর আগে বিভিন্ন সরকারের সময় কয়েক মাসের জন্য বন্ধ থাকার ঘটনা ঘটলেও এত দীর্ঘ সময়ের জন্য গ্যাস সংযোগ বন্ধ রাখার ঘটনা এটাই প্রথম। বর্তমান সরকারের দাবি, গত ৩ বছরে গ্যাসের উৎপাদন বেড়েছে সাড়ে ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট। আবাসন খাতে নতুন সংযোগ দিলেও প্রয়োজন হবে মাত্র ১০ মিলিয়ন ঘনফুট।
গৃহায়ন খাতের উদ্যোক্তাদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট এন্ড হাউজিং এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব) সূত্র জানায়, ফ্ল্যাটের কেনা-বেচা সম্প্রতি ৪২ শতাংশ কমেছে। উন্নয়ন কাজ শেষ হলেও গ্যাস সংযোগ না থাকায় কয়েক লাখ ফ্ল্যাট ও এ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে উদ্যোক্তাদের অন্তত ৯০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ ঝুঁকিতে রয়েছে। এ অবস্থায় বিপুল পরিমাণ ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করতে না পারায় যেকোনো সময় আবাসন খাতে বড় রকমের ধস নামতে পারে। গৃহায়ন খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আড়াই শতাধিক শিল্পের প্রায় ১০ হাজার প্রতিষ্ঠান বন্ধ এবং আড়াই কোটি লোকের বেকার হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে ৫০ হাজারের বেশি রেডি ফ্ল্যাট এখন অবিক্রীত অবস্থায় রয়েছে।
জানা যায়, গ্যাস সংযোগ না থাকায় মন্দার কবলে পড়েছে দেশের আবাসন শিল্প। অর্থনৈতিক মন্দার কারণে আবাসন খাতে এমনিতেই চলছে ক্রেতা সংকট। ফ্ল্যাট ও প্লটের ক্রেতা নেই। তাই বিক্রিও নেই। এ অবস্থায় অনেক প্রতিষ্ঠানে শুরু হয়েছে কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাঁটাই। বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে বহু আবাসন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। এ অবস্থায় গ্যাস সংযোগ সমস্যা দীর্ঘায়িত হলে গোটা আবাসন খাতে বিপর্যয় দেখা দিতে পারে বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।
রিহ্যাবের একজন কর্মকর্তা বলেন, সরকার আবাসন সংকট মোকাবিলায় সত্যিই আন্তরিক নয়। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে এ খাতে চলছে লুকোচুরি। নির্মাণ কাজ শেষ করেও গ্যাস সংযোগ না পাওয়ায় এ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি করতে পারছেন না উদ্যোক্তারা।
রিহ্যাব সূত্রে জানা গেছে, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ মেটাতে গত ২০ বছরে ঢাকায় প্রায় এক লাখ নতুন এ্যাপার্টমেন্ট তৈরি হয়েছে। জাতীয় অর্থনীতিতে এ খাতের অবদান অন্তত ১৩ শতাংশ। এ খাতে দুর্যোগ নেমে এলে অন্তত পাঁচ কোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে সূত্র দাবি করে।
 
শুক্রবার 28 September 2012
 

Thursday, August 30, 2012

ব্লু মুন বা নীল চাঁদ

ব্লু মুন বা নীল চাঁদ 

প্রচলিতভাবে আমরা প্রতি মাসে একটিমাত্র পূর্ণিমা দেখতে পাই, কিন্তু কখনো কখনো এমন ঘটে যে একটি মাসে দুইটি পূর্ণিমা ঘটে থাকে। কোন মাসের এই দ্বিতীয় পূর্ণিমাটিই হচ্ছে ব্লু মুন। এইক্ষেত্রে প্রথম পূর্ণিমাটি মাসের একদম শুরুতে বা শুরুর কাছাকাছি সময়ে হয়ে থাকে। কারণ চান্দ্র মাস ২৯.৫ দিনে সম্পন্ন হয়। ফলে ফেব্রুয়ারি মাস ছাড়া অন্য যেকোন মাসেই দুইটি পূর্ণিমা ঘটতে পারে। কারণ ফেব্রুয়ারি মাসের দৈর্ঘ্য চান্দ্রমাসের চেয়ে কম।
ব্লু মুন কেন ঘটে
আমরা জানি সৌর বর্ষপঞ্জিতে বারোটি পূর্ণ চন্দ্র মাস সম্পন্ন হয়ে থাকে অর্থাৎ বারোটি পূর্ণিমা ঘটে। তবে সৌর মাসের তুলনায় চান্দ্রমাসে দৈর্ঘ্য কম। চান্দ্র মাস ২৯.৫ দিনে সম্পন্ন হয়। সাধারণ হিসেবে বলা যায়, চান্দ্র বছর সৌর বছরের তুলনায় গড়ে এগারো দিন কম হয়ে থাকে। এই অতিরিক্ত দিনগুলোর কারণে গড়ে প্রতি ২.৭ বছরে এমন একটি মাস পাওয়া যায় যখন একই মাসে দুইটি পূর্ণিমা ঘটে। একইভাবে প্রতি ১৯ বছরে ৭ বার এমন পূর্ণিমা পাওয়া যায়।
ব্লু মুনেরও ব্যতিক্রম
ব্লু মুন নিজেই একটি ব্যতিক্রম ঘটনা হলেও এর ক্ষেত্রেও কখনো কখনো আরেকটি অদ্ভূত ঘটনা ঘটে থাকে, যেমন একই বছরে দুইবার ব্লু মুনের দেখা পাওয়া। গড়ে প্রতি ১৯ বছরে মাত্র একবারই এমনটি ঘটে। সর্বশেষ ১৯৯৯ সালের জানুয়ারি এবং মার্চ মাসে পর পর দুইবার ব্লু মুন দেখা গিয়েছিল। তবে এই ঘটনা শুধু জানুয়ারি এবং মার্চ মাসেই ঘটা সম্ভব। কারণ এই দুই মাসের মধ্যে সবচেয়ে ছোট মাস ফেব্রুয়ারি রয়েছে, এর দৈর্ঘ্য সাধারণত মাত্র ২৮ দিন। তাই প্রতি ১৯ বছরে ফেব্রুয়ারি মাসটি একবার প্রভাবক হিসেব কাজ করে। তবে যদি জানুয়ারি এবং মার্চ মাসে পর পর এমন ঘটনা ঘটে সেক্ষেত্রে ফেব্রুয়ারি মাসে কোন পূর্ণিমা দেখা যাবে না। কারণ জানুয়ারি মাসের একেবার শেষ দিকে পূর্ণিমা ঘটলে চান্দ্রমাসের হিসেবে ফেব্রুয়ারি মাসে কোন পূর্ণিমা না ঘটে মার্চ মাসের শুরুতে পূর্ণিমা ঘটবে। এরকমটি আবার ঘটবে ২০১৮, ২০৩৭ সালে। এভাবে ১৯ বছর পর পর নিয়মিতভাবে।
ব্লু মুন নামকরণ কেন
এই বিশেষ পূর্ণিমাকে ব্লু মুন বা নীল চাঁদ নাম দেয়া হলেও দৃশ্যত এই পূর্ণিমায় চাঁদকে মোটেও নীল রঙের দেখায় না, বরং অন্য পূর্ণিমার মতই পুরোপুরি সাদৃশ্যপূর্ণ। তাহলে নীল চাঁদ নামের কারণ কি? ইংরেজিতে Blue Moon পদটি দ্বারা কোন অসাধারণ ঘটনাকে প্রকাশ করা হয়। এই নামটি প্রায় চারশ’ বছর ধরেই প্রচলিত ছিল। তবে গত পচিশ বছর ধরে বর্ষপঞ্জিতে এই নামটি বিস্তৃতি লাভ করেছে। ‘অমাবস্যার চাঁদ’ বাক্যটি যেমন দুস্প্রাপ্য কিছু বোঝাতে বাংলায় প্রবাদ বাক্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়, ঠিক তেমনি ইংরেজিতে ‘once in a blue moon’ বাক্যটিও ব্যবহৃত হয়। ধারণা করা হয় প্রাচীন সময়ে মানুষের মনের বিভিন্ন কুসংস্কার বা বিশ্বাস থেকে এই ব্লু মুন নামটি এসে থাকতে পারে। তবে সাম্প্রতিক সময়ের কিছু কিছু ঘটনা থেকে এই নামকরনের কিছুটা মিল খুঁজে পাওয়া যায়, যা কিছুটা ঐতিহাসিকও বটে।
১৮৮৩ সালে ইন্দোনেশিয়ায় ক্রাকাতোয়া অগ্নুৎপাতের কারণে পরবর্তী দুই বছর সূর্যাস্তের সময় সবুজ এবং চাঁদকে নীলাভ দেখা গেছে। এছাড়া ১৯২৭ সালে ভারতীয় মৌসুমী বায়ু দেরীতে আসার কারণে গ্রীষ্মকাল অতি দীর্ঘ হয়ে পড়ে, যা বায়ুমন্ডলে ধূলার পরিমাণ বাড়িয়ে তোলে, তখন রাতের আকাশে চাঁদকে নীলাভ দেখাত। ১৯৫১ সালে উত্তর আমেরিকার উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের চাঁদকেও নীল দেখা গিয়েছিল যখন পশ্চিম কানাডার বনাঞ্চলে দাবানল লেগেছিল এবং এর ধোঁয়া আকাশকে আচ্ছন্ন করে ফেলে।
উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এটা সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে ব্লু মুন প্রকৃতপক্ষে দেখতে মোটেও নীল নয়। তবে আকাশে ধুলোবালি বা ধোঁয়ার কারণে চাঁদকে সাময়িকভাবে নীলাভ মনে হতে পারে। এটি সময়ের ধারাবাহিকতায় সংঘটিত হওয়া একটি মহাজাগতিক ঘটনা ছাড়া আর কিছুই নয়।
কুসংস্কার ত্যাগ করুন
মানুষের জীবন ও কাজের উপর সাধারণ পূর্নিমা বা ব্লু মুন কোনটিরই প্রভাব নেই, এটি শুধুমাত্র প্রাকৃতিক নিয়মে ঘটে চলা একটি মহাজাগতিক ঘটনা মাত্র। তাই মানুষের শরীরের উপর পূর্ণিমার ক্ষতিকার প্রভাব বা ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের মত বিশ্বাস নেহায়েৎ কুসংস্কার। তবে দারিদ্রতা-অশিক্ষা-অজ্ঞানতা-সাম্প্রদায়িকতা-রোগ-মানসিক যন্ত্রণা নানা কারণে আমাদের কুসংস্কারাচ্ছন্ন মন খুব সহজেই মহাজাগতিক ঘটনাবলীকে ভর করে নিজেদের সমস্যা সমাধানের পথ খুঁজে নেয় বা তার বশবর্তী হয়ে পড়ে। তাই কোনরকম কুসংস্কারে বিশ্বাস না করে, ভ্রান্ত ধারনায় পরিচালিত না হয়ে স্নাত হোন এই বিশেষ পূর্ণিমার অপূর্ব জোছনায়। বিজ্ঞানমনস্কতা আর বিজ্ঞানঘনিষ্ঠতায় বেড়ে উঠুক আগামীর প্রজন্ম, সেই প্রত্যাশা আমাদের।

 Source: http://cosmicculture.org

Sunday, August 12, 2012

ভাষার ব্যবহার ও গালি বৃত্তান্ত

ভাষার ব্যবহার ও গালি বৃত্তান্ত

লিখেছেন: মোজাফফর হোসেন

ক
মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ আবিষ্কার হল ভাষা বা ভাষার ব্যবহার। মানুষ অন্যসব প্রাণীদের থেকে এগিয়ে তার অন্যতম কারণ হল মানুষের ভাষা জ্ঞান। ভাষার ব্যবহারের মধ্য দিয়ে সভ্যতার বিকাশ ও প্রকাশ ঘটেছে। ভাষার ব্যবহার করেই মানুষ হয়েছে বিখ্যাত, জাতিগত ভাবে উন্নত। সক্রেটিস যদি ভাষাহীন হতেন, গ্যালিলিও যদি তার বিশ্বাসের কথা না বলতেন তাহলে তাদের ঐভাবে মরতে হত না। ভাষা না থাকলে জন্ম হত না কোন ধর্ম গ্রন্থ কিংবা দর্শন শাস্ত্রের। ভাষা না থাকলে বিখ্যাত হতেন না মিল্টন, রবীন্দ্রনাথ, গ্যেটে, তলস্তয়সহ পৃথিবীর কোন কবি সাহিত্যিক। ভাষা না থাকলে জন্ম হত না প্লেটো, ফ্রয়েড, ডারউইন, কার্ল মার্ক্স-এর। ভাষার মধ্য দিয়েই আন্দোলন করেছেন লেলিন, গোর্কি, গান্ধি, ম্যান্ডেলাসহ পৃথিবীর সকল যোদ্ধা। আরও পরিষ্কার করে বলতে গেলে, মার্টিন লুথার কিং এর ভাষণ ‘I have a Dream’ কিংবা শেখ মুজিবের রেডকোর্স ময়দানের সেই ভাষণ, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ তাঁদের স্ব স্ব জাতির জন্য মুক্তির পথ বাতলে দিয়েছে। আবার এই ভাষাকেই ব্যবহার করে হিটলার পরিচালনা করেছেন পৃথিবীর জঘন্যতম হত্যাযজ্ঞ। ঘটে গেছে অসংখ্য যুদ্ধ। সুতরাং দেখা যাচ্ছে ভাষার ব্যবহার মানুষের অন্যতম হাতিয়ার। বলাই বাহুল্য, মানুষ ভাষাহীন হলে তার চেতনার কোন মূল্য থাকতো না তা যতই মঙ্গলকামী হউক না কেন, এবং অবশ্যই, পৃথিবীর ইতিহাস ভিন্নতর হত।
খ.
গালিগালাজ বা গালমন্দ হল ভাষার অন্যতম বহুল ব্যবহার। গালিগালাজ মানুষের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে বটে তবে ক্ষেত্রবিশেষ এর প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। মানুষ যেদিন থেকে ভাষার ব্যবহার শিখেছে সেদিন থেকেই শুরু হয়েছে গালির ব্যবহার। এই গালিগালাজের প্রকার ও ধরণ আবার সমাজ ভেদে ভিন্নতর। এক স্থানের স্তুতি কথা অন্যস্থানে গালি হিসাবে ব্যবহারের নজির দেখা যায়। যেমন, যুক্তরাজ্যে fag মানে সিগারেট, কিন্তু যুক্তরাষ্টে fag বলতে হোমোসেক্সুয়াল পুরুষ বোঝায়। বাংলাদেশের বিভিন্নস্থানে ‘খাসি’ শব্দটা অস্তিবাচক হিসাবে ব্যবহার করা হলেও মেহেরপুরে এটাকে গালি হিসাবে ব্যবহার করা হয়। আমাদের দেশে, বন্ধুদের মাঝে বা ইনফর্মাল আড্ডায় ‘শালা’, ‘গাধা’, ‘কুত্তা’ এ জাতিয় শব্দ গালি মনে না হলেও বড়দের মাঝে বা ফর্মাল কোন বৈঠকে তা ব্যবহার করা হলে গালি হিসাবে গণ্য করা হবে। আবার সমাজের অশিক্ষিত মানুষের কাছে যা বুলি তা অনেকসময় শিক্ষিত মানুষের কাছে গালি হিসাবে চিহ্নিত হয়। যেমন আমাদের দেশে নিম্নশ্রেণীর মানুষেরা ‘মাগি’, ‘ভাতার’, ‘মিনসে’ শব্দগুলো সাধারণ অর্থেই ব্যবহার করে কিন্তু এই শব্দগুলো শিক্ষিত সমাজে গালি হিসাবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। জেন্ডার ভেদেও গালির ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়। পুরুষদের সাধারণ আড্ডায় অনেক শব্দ ব্যবহার করা হয় যা নারী মহলে গালি হিসাবে চিহ্নিত। যেমন, হুদায়, চোঁদনা, বাড়া, বকচোদ ইত্যাদি।
গালি হিসাবে যে শব্দগুলো ব্যবহার করা হয় লক্ষ্য করলে দেখা যাবে তার বেশির ভাগই এসেছে প্রাণী বা নিম্নশ্রেণীর জীব থেকে, যেমন- কুত্তা, গাধা, ছাগল, পাঠা, শুয়োর, ছুঁচো, পেঁচা, মষ (মহিষ), বান্দর ইত্যাদি; কিছু এসেছে নেতিবাচক শব্দ থেকে, যেমন- ফালতু, রোগা, মূর্খ, বোকা, হাঁদা, মরণ, পচা, চাষা ইত্যাদি; কিছু এসেছে রোগের নাম এবং শারীরিক ত্রুটি থেকে, যেমন- পাগল, কলেরা, যক্ষ্মা, বসন্ত, মৃগী, জিনে ধরা, কানা, খুড়া, কালা ইত্যাদি; কিছু এসেছে নিম্নশ্রেণীর পেশা থেকে, যেমন- চোর, ডাকাত, কুলি, মুটে, মুচি, মেথর ইত্যাদি; কিছু এসেছে সম্পর্ক থেকে, যেমন- শ্যালা, শালী, সতীন, মাগ, ভাতার ইত্যাদি; কিছু এসেছে মানুষের যৌনাঙ্গ থেকে, যেমন- বাল, বাড়া, ভোদা, ধন ইত্যাদি; অনেক সময় বিদেশী শব্দ থেকেও গালি আসে, যেমন- হারাম, মাদার-ফাকার, হেল, বাস্টার্ড, ফ্রড, শয়তান, কামিনে, কাফের; কিছু গালি এসেছে ইতিহাস এবং পুরাণের পাতা থেকে, যেমন- মীরজাফর, হিটলার, রাজাকার, নমরুদ, ফেরাউন ইত্যাতি; আবার শব্দ coinage-এর মাধ্যমে কোন কোন সাহিত্যিক গালি নিয়ে আসেন, যেমনটি শেকসপিয়র করেছেন। আবার অনেক শব্দ বুৎপত্তিগত অর্থে অশালীন না হলেও প্রয়োগের কারণে গালি হিসাবে গণ্য করা হয় যেমন, মাগী। এই শব্দটির বুৎপত্তিগত অর্থ হচ্ছে নারী। কিন্তু প্রায়োগিক অর্থে খারাপ স্বভাবের নারী বা বেশ্যার সমার্থক হিসাবে গণ্য করা হয়। অথচ, মাগীর বিপরীত শব্দ মাগ সাধারণ অর্থেই ব্যবহৃত হয় বেশি।
গালি বলতে যে সবসময় অশালীন শব্দকে বোঝান হয় বিষয়টি তা নয়। এটা নির্ভর করে শব্দটাকে কিভাবে, কোন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে। অশালীন শব্দ প্রয়োগের কারণে গালি হিসাবে গণ্য নাও হতে পারে আবার শালীন শব্দ ব্যবহারের মারপ্যাচে গালি হিসাবে গণ্য হতে পারে। যেমন যখন বলা হচ্ছে, ‘বেশ্যালয় গমনে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিৎ’। তখন বেশ্য শব্দটি গালি হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে না। কিন্তু যখন বলা হচ্ছে, ‘তুই একটা বেশ্যার জাত’, তখন বেশ্যা শব্দটা গালি হিসাবে চিহ্নিত হচ্ছে। শিক্ষিত সমাজে কথার মারপ্যাচে গালি দেওয়ার প্রবনতা বেশি। এজন্য ভাষা-জ্ঞান ভাল হওয়া চায়। যেমন, ক্রিকেট মাঠে রড মার্শ একবার ইয়ান বোথামকে বলেছিলেন, ‘হায় ইয়ান, তোমার বউ আর আমার বাচ্চারা কেমন আছে?’ জবাবে বোথাম বলেছিলেন, ‘বউ ভালোই আছে কিন্তু বাচ্চারা সব বিকলাঙ্গ হয়ে জন্মেছে দেখছি।’
গালি হিসাবে এসব শব্দের ব্যবহারের অন্যতম কারণ হল মানুষের ভাষার সীমাবদ্ধতা। মানুষকে তার বৈচিত্র্যময় অনুভূতির প্রকাশ ঘটাতে বিভিন্ন প্রকারের রূপকের (image) আশ্রয় নিতে হয়। গালি হচ্ছে ভাষার মেটাফরিক উপস্থাপন। যেমন- সে আস্ত একটা গাধা (metaphor), লোকটি কুত্তার মত ঘেউ ঘেউ করছে (simile)। পেট হাগস-এর মতে, ‘Slang is a non-standard language composed of exaggerated metaphors’। কে.জি. চেস্টারসন বলেছেন, ‘all slung is metaphor and all metaphor is poetry’।
গ.
সাহিত্যে গালির ব্যবহার বিশেষভাবে লক্ষণীয়। কারও কারও সাহিত্য অত্যধিক গালির কারণে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সাহিত্যিকদের হাত ধরে আমদানি হয়েছে হরেক রকমের গালি। যেমন, শেক্সপিয়ারের মাধ্যমে ইংরেজি ভাষায় যুক্ত হয়েছে অনেক নতুন গালি। গ্রীক ড্রামা ’লিসিসট্রাটা’ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল অতিরিক্ত খোলামেলা ভাষা বা bawdy language ব্যবহারের কারণে। বাংলাসাহিত্যে গালিগালাজের জন্য অভিযুক্ত করা হয়েছে, তসলিমা নাসরিন, হুমায়ূন আজাদসহ অনেককেই ।
চলতি সময়ে চলচ্চিত্রে গালির ব্যবহার চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। ইংরেজি সিনেমা এই দিক দিয়ে সবার উপরে। মাদার ফাকার, ফাক্, সাকার, ব্ল্যাডি হেল, ডিক, শব্দগুলো গালি হিসাবে হরহামেশাই ব্যবহৃত হচ্ছে। যেমন- ‘mother fucker snakes in the mother fucker plain!’ (Movie: Snakes on a Plane)। বাংলা চলচ্চিত্রে একসময় অশ্লীল শব্দের ব্যবহার চুড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হয়েছিল। বর্তমানে সেন্সর বোর্ড-এর তৎপরতার কারণে বেশ কমে গেছে। বাংলা সিনেমায় ইংরেজি সিনেমার মত সব চরিত্র যখন তখন গালি ব্যবহার করে না। সাধারণত, শুধুমাত্র ভিলেনদের মুখেই গালি শোনা যায়। বাংলা সিনেমায় বহুল ব্যবহৃত কিছু গালি হচ্ছে- হারামজাদা, হারামখোর, শুয়ারের বাচ্চা, কুত্তার বাচ্চা, নটির মেয়ে/ছাওয়াল।
বর্তমানে খেলাধুলাতেও গালির ব্যবহার লক্ষণীয়। বিপরীত খেলোয়াড়দের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক অস্থিরতা বা মনোযোগের বিগ্ন ঘটানোর জন্য এই গালি দেওয়া হয়। সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ফুটবল থেকে শুরু করে, হালে ভদ্রলোকের খেলা বলে খ্যাত ক্রিকেট খেলাতেও গালির ব্যবহার লক্ষ্য করার মত। একে খেলার ভাষায় স্লেজিং বলা হয়। যেমন, একবার এক বোলার ব্যাটসম্যানকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, ‘এই বলেও যদি তুমি ছক্কা মারতে পার, তাহলে তুমি যা চাও তাই পাবে!’ জবাবে ঐ ব্যাটসম্যান বলেছিলেন, ‘যাও তোমার বউকে বিছানায় রেডি হতে বল’গে!’ আর সাইমন্ডস আর হরভজনের একে অপরকে ‘মানকি’ বলে গালিগালাজ করার ব্যপারটা তো সকলেরই জানা।
ঘ.
ভাষা ক্লাস এজেন্ট হিসাবে কাজ করে। তাই তো সমাজের অর্থনৈতিক অবস্থার তারতম্যের কারণে গালির পার্থক্য ঘটে থাকে। অবশ্যই অর্থনীতি অন্যসব কিছু নির্ধারণের পাশাপাশি মানুষের ভাষা নির্ধারণ করে থাকে। যারা সমাজে উঁচু স্থানে অধিষ্ঠিত বা যাদেরকে আমরা উচ্চবিত্ত বলছি তারা নিম্নমধ্যবিত্ত বা শ্রমিকশ্রেণীকে তুচ্ছার্থে নানাবিধ গালি ব্যবহার করে থাকে। বাংলাদেশে শ্রমিকশ্রেণীদের সাথে মালিকশ্রেণী খুব বাজে ভাষায় কথা বলে। এমনকি রিকশাচালক, মুটে, কুলি-মজুর সবাই এই ভাষা-বৈষম্যের স্বীকার হয়। এটা এক ধরনের অপরাধ বটে।
ভাষা জেন্ডার এজেন্ট হিসাবেও কাজ করে। ফলত, আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত গালিগুলোর দিকে লক্ষ্য করলে দেখতে পাব, গালিগুলো সুস্পষ্টভাবে পুরুষত্বের হাতিয়ার হিসাবে কাজ করছে। সমাজে মাদার ফাকার, বেশ্যা, নটী, খানকি, মাগি, হারামজাদি, ছিনাল, ভুদাই প্রভৃতি গালিগুলো সর্বাধিক ব্যবহৃত হয়। মা তুলে গালি দেওয়াটা একটা ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। কথায় কথায় বলতে শোনা যায়, ‘তোর মাকে **দি,’ ‘জন্মের ঠিক নেই’, ‘বেশ্যার ছাওয়াল’, ‘মাগির কামড় বেশি’- এ গালিগুলো সামগ্রিকভাবে নারী জাতিকে হীন করে তোলে।
গালি নিয়ে সমাজের শিক্ষিত মহলে বেশ অসন্তোষ দেখা যায়। কেউ কেউ মনে করেন, আইন করে পাবলিক প্লেসে গালি নিষিদ্ধ করা উচিৎ। কারও কারও ধারনা গালি ভাষায় সৌন্দর্য ও পবিত্রতা নষ্ট করে সুতরাং তা ভাষা থেকে ছেঁটে দেওয়া উচিৎ। যদি তাদের কথা মত গালি নিষিদ্ধ করা হয় তাহলে কি ঘটতে পারে তা একবার ভেবে দেখা দরকার। তাহলে গালির প্রয়োজনীয়তা পরিষ্কার হয়ে উঠবে। গালি কখনই ভাষার সৌন্দর্য নষ্ট করে না বরং তা আরও picturesque করে তোলে। ভাষাকে ক্ষেত্রবিশেষ করে তোলে প্রাণবন্ত-সজীব। গালি না থাকলে সবচেয়ে বড় যে ক্ষতিটা হত তা হল, মানুষে মানুষে দৈহিক হাঙ্গামা বেড়ে যেত বহুগুণে। মানুষ ভাষা বা অভিব্যক্তির মধ্য দিয়ে রাগ মেটাতে না পেরে একে অন্যের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তো। হারামখোর, শুয়োরের বাচ্চা বলে যে কাজটি অনায়াসে হয়ে যায়, সেই কাজটি হতে লাঠি চালাচালি হত। বিশৃঙ্খলা বেড়ে যেত কয়েকগুণে।
শুধু রাগ না ভালোবাসা প্রকাশের ক্ষেত্রেও গালির জুড়ি নেই। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বেশির ভাগ মানুষই স্ত্রী বা প্রেমিকার সাথে যৌনমিলনের চরম মুহূর্তে একে অপরের উদ্দেশ্যে প্রচুর অশালীন শব্দ বা গালি ছুড়ে মারে এবং এতে তাদের উত্তেজনা কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাই। জেমস জয়েস ও তাঁর স্ত্রীর মধ্যকার পত্রগুলো পড়লে বোঝা যায় যে তাঁদের ভালোবাসা প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম ছিল স্ল্যাং বা গালি। অনেক সময় নানা কিংবা দাদা সম্পর্কের মুরুব্বিরা নাতি সম্পর্কের ছোকরাদের দিকে গালি ছুড়ে মজা পান। অনেকে মজা করার জন্য সচেতন ভাবেই পরিবারে বা বন্ধু মহলে গালিগালাজ করে। এ জন্য বলা হয়- ‘humors are nothing but slang’। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, গালি ভাষার নতুন এক উপযোগ সৃষ্টি সাপেক্ষ মানুষের জীবনে রসের সঞ্চার করেছে।
Source: http://mukto-mona.com